সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা – বারি

১৯৯০ সালে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আওতাধীন তৎকালীন কৃষি প্রকৌশল বিভাগ বিভক্ত হয়ে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা এবং এফএমপিই এই দুইটি পূণাঙ্গ গবেষণা বিভাগ হিসেবে আত্ম প্রকাশ করে। এর আগে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা কৃষি প্রকৌশল বিভাগের একটি শাখা ছিল। জন্মলগড়ব হতেই অত্র বিভাগ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আওতাধীন ফসলের বিভিনড়ব বৃদ্ধি পর্যায়ে সেচের সঠিক সময় ও সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ সহ সেচের তালিকায়ন ফসল ভেদে সেচের নূতন নূতন পদ্ধতি উদ্ভাবন, ভূগর্ভস্থ পানির সুষ্ঠু ব্যবহারসহ সেচের পানির প্রয়োগের সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন সহ সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক নানামুখী গবেষণা করে আসছে। বিগত প্রায় ১০ বৎসর যাবৎ উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় লবণাক্ত মাটি ও পানির সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিনড়ব ফসল উৎপাদনের কিছু সংখ্যক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশের পাহাড়ী অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে ছড়া/নালায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে উক্ত পানি দিয়ে ফসল উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছে। এই পর্যন্ত অত্র বিভাগ হতে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রায় ৪৫টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। যাদের অধিকাংশই কৃষক পর্যায়ে প্রয়োগ করে কৃষক লাভবান হচ্ছেন। অত্র বিভাগের বিজ্ঞানীগণ বিগত প্রায় ৮/১০ বৎসর যাবৎ উচ্চমূল্যের ফসলে মাইμো সেচ পদ্ধতি যেমন : ড্রিপ, ফার্টিগেশন, স্প্রীংলার এর গবেষণা কর্মকা- পরিচালনা করে আসছে। ইতিমধ্যে তাহারা টমেটো (শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন), বেগুন, ক্যাপসিকাম, স্ট্রবেরী, তরমুজ, পেঁপে, পেয়াজ, রসুন ইত্যাদি ফসলের জন্য ফার্টিগেশন ও স্প্রীংলার সেচ প্রযক্তি উদ্ভাবন করেছেন যেগুলি মধ্যম মানের কৃষকসহ বাণিজ্যিক কৃষকগণ উল্লিখিত প্রযুক্তিসমূহ ব্যবহার করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। বর্তমানে উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে স¦াদু পানি/লবণাক্ত পানি মিশ্রণে বিভিনড়ব ফসলে উৎপাদনে সেচ প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগ সৌরচালিত সেচ পাম্পের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনের সম্ভাব্যতা, গ্রীষ্মকালীন মরিচ উৎপাদনে জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু উনড়বত জাত উদ্ভাবনে গবেষণা কর্মকা- চলমান আছে।

 

পানির বিভাজন যন্ত্রের ব্যবহার

পানির বিভাজন যন্ত্রটি হলো এমন একটি যন্ত্র যার মাধ্যমে একই সময়ে ব্যবহার করে ২ থেকে ৪ জন কৃষক ভিনড়ব ভিনড়ব ফসল বা একই ফসলের বিভিনড়ব জমিতে সেচ দিতে পারে। সাধারণত দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটিতে মসলা জাতীয় শস্যসহ সবজি ফসলে সেচ দেওয়ার সময় অত্যাধিক পানি প্রবাহের কারণে গাছের গোড়ায় মাটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, গাছের মূলের ক্ষতি হয় এবং পানির অপচয় হয়। এতে শস্যের ফলন অনেক কমে যায়। তাই পানির বিভাজন যন্ত্রের সাহায্যে যদি পানির প্রবাহকে ভিনড়ব ভিনড়ব ফসলের জন্য ব্যবহার করা হয়, এতে পানি প্রয়োগের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। পেঁয়াজ ও রসুনসহ অন্যান্য মসলা জাতীয় ফসল এবং ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুÍন, টমেটো প্রভৃতি ফসলের জন্য যন্ত্রটি অধিকতর উপযোগী। পিভিসি উপকরণ দিয়ে এ যন্ত্রটি স্থানীয়ভাবে তৈরি করা যায়।

লবণাক্ত ও খরাপ্রবণ এলাকায় ড্রিপ/ফার্টিগেশন সেচ ও মাল্চ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন

ড্রিপ/ফার্টিগেশন বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সেচ প্রযুক্তি যার চাহিদা μমান¦য়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ড্রিপ সেচ ট্রিফল বা মাইμো সেচ নামেও পরিচিত। ড্রিম/ফার্টিগেশন এমন একটি সেচ পদ্ধতি যা পানির ভাল্ভ, পাইপ এবং এমিটার্স নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাটির পৃষ্ঠ বা সরাসরি গাছের শিক— অঞ্চলে ধীরে ধীরে ফোঁটা ফোঁটা করে পানি দেয়া হয়। পানিতে দ্রবণীয় সার যেমন ইউরিয়া, পটাশ ইত্যাদি পানির সাথে মিশিয়ে ফার্টিগেশন পদ্ধতিতে সময়মত ফসলে প্রয়োগ করা হয়। সাধারণত: প্রতি ১৪০ লিটার পানিতে এক কেজি সার মিশাতে হয়। ড্রিপ/ফার্টিগেশন সেচ এবং মাল্চ প্রয়োগ করে বিভিনড়ব ফসল/ফল যেমন ঃ টমেটো, বেগুন, তরমুজ, ক্যাপসিকাম, পেঁপে, গোয়াবা, স্ট্রবেরি ইত্যাদি উৎপাদন করা সম্ভব। ড্রিপ সেচ পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পানি ২/৩ দিন পর পর প্রয়োগ করতে হয়। এই পদ্ধতি প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে শতকরা ৩০-৪০ ভাগ পটাশ, ৪০-৪৫ ভাগ ইউরিয়া এবং ৫০-৫৫ ভাগ সেচের পানি সাশ্রয় হয় এবং প্রচলিত পদ্ধতির শতকরা চেয়ে ২০-২৫ ভাগ ফলন বেশি পাওয়া যায় ও অধিক মুনাফা অর্জন সম্ভব। ড্রিপ সেচের ফলে গাছের মূলাঞ্চলের মাটির লবণাক্ততা কমে যায় যা ফলন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। খরাপী—িত ও সেচ সংকট এলাকা, লবণাক্ত এবং পাহাড়ী অঞ্চলে সেচের পানির অভাব থাকায় সেখানে ড্রিপ/ফার্টিগেশন এবং মাল্চ খুব উপযোগী প্রযুক্তি। বর্তমানে এ পদ্ধতির যাবতীয় উপকরণ স্থানীয়ভাবে তৈরি করা যায়।

 

শস্য বিন্যাস ভিত্তিক সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় লবণাক্ত ও খরা প্রবণ এলাকার জন্য টেকসই ফসল উৎপাদনে শস্য বিন্যাস ভিত্তিক পরিমিত সেচ ও যথাযথ পানি ব্যবস্থাপনার ফলে জমি ও পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। বিএআরআই এর সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগ, International Centre for Biosaline Agriculture (ICBA), দুবাই এর সঙ্গে পারস্পারিক সহযোগিতায় গবেষণার মাধ্যমে জানা যায় যে,উপকূলীয় অঞ্চলে উচুঁবেডে মালচ্ এবং ড্রিপ সেচের মাধ্যমে মাটির লবণাক্ততা উল্লেখ্যযোগ্য পরিমাণে (১০-১২ ডিএস/মি হতে ৪.৫-৫.৫ ডিএস/মি) হ্রাস পায় এবং ফলনও প্রচলিত সেচ পদ্ধতির চেয়ে অধিকতর বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে বিএআরআই এর সরেজমিন গবেষণা বিভাগ এবং সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগ পারস্পরিক সহযোগিতায় পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয়ের অর্থায়নে পরিবর্তিত জলবায়ু মোকাবেলায় খরাপ্রবণ ও লবণাক্ত অঞ্চলে টেকসই শস্যবিন্যাস ভিত্তিক উনড়বত সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কার্যμম পরিচালিত হচ্ছে। শস্যবিন্যাস ভিত্তিক সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তির ব্যবহারে লবণাক্ত ও খরাপীড়িত এলাকার কৃষকগণ লাভবান হচ্ছে। সাথে সাথে সেচের পানির সাশ্রয়ী ফসলধারা চাষ করার জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। যার ফলে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন হ্রাস পাবে এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়তা করবে।

ফসল উৎপাদনে শহর/পৌর বর্জ্য পানির ব্যবহার

শহর/পৌর বর্জ্য পানিতে ক্ষতিকর উৎপাদনের পরিমাণ খুবই কম থাকে বিধায় ফসল উৎপাদনে শহর/পৌর বর্জ্য পানি ব্যবহারের ঝুঁকি নেই। তাই শহরের বর্জ্য পানি শুষ্ক মৌসুমে ফসলভাবে সেচ কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। গবেষণালব্ধ ফলাফলে দেখা গেছে যে, শহর/পৌর বর্জ্য পানি দ্বারা গম, ভ্ট্টুা, আলু ইত্যাদি ফসলে সেচ দিলে ফলন বৃদ্ধির সাথে সাথে শতকরা প্রায় ২০-২৫% রাসায়নিক সার সাশ্রয় হয় এবং উৎপাদন খরচ ও কমে যায়। তবে পৌর বর্জ্য পানিতে ক্ষতিকর ব্যাকটোরিয়া থাকার কারণে সালাদ জাতীয় ফসল চাষে সেচ দেওয়ার জন্য সতর্কতা থাকা প্রয়োজন। রাজশাহী শহরতলীসহ অন্যান্য খরাপ্রবণ শহরতলী এলাকায় এই প্রযুক্তি ব্যবহারে অধিক ফসল উৎপাদনে সহায়তা করবে।

 

অল্টারনেট ফারো সেচ পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন

কৃষি কাজে ফসল উৎপাদনে পানির সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থা না থাকায় পানির অপচয় বেড়ে যায় এবং সেচ এলাকাও কমে যায় এবং গাছের চাহিদা অনুযায়ী যথাযথ পানির অভাবে ফলন কমে যায়। ফলে অপচয় রোধ এবং সেচ এলাকা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অল্টারনেট ফারো সেচ পদ্ধতি নামে নতুন একটি সেচ পদ্ধতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বাংলাদেশে প্রম উদ্ভাবন করে। এটি এমন একটি সেচ পদ্ধতি যার মাধ্যমে একটি ফারো অন্তর অপর ফারোতে পানি সরবরাহ করা হয়। দুই ফারোর মধ্যবর্তী ফারো শুষ্ক থাকে যা পরবর্তী সেচের সময় শুষ্ক ফারোতে পানি সরবরাহ করা হয় এবং পূর্বের সেচকৃত ফারোগুলো পরবর্তী সেচের সময় শুষ্ক রাখা হয়। এই পদ্ধতিতে ফসলের তেমন কোন ক্ষতি না করে শতকরা প্রায় ৩০-৩৫% পানি সাশ্রয় হয়। এই পদ্ধতি সারিতে লাগানো ফসল যেমন- টমেটো, ভুট্টা, আলু ইত্যাদি উৎপাদনে ফারোর মাধ্যমে সেচের জন্য উপযুক্ত। খরাপ্রবণ ও লবণাক্ত এলাকায় ফসল উৎপাদনে যেখানে পানির ব্যবহার সীমিত, সেসব এলাকায় সেচের পানি বিতরণের ক্ষেত্রে এটি একটি সহজতর সময়োপযোগী কৃষক বান্ধব সেচ পদ্ধতি।

ঘাটতি সেচ এবং মাল্চ পদ্ধতিতে ফসল/বীজ উৎপাদান

যে সকল এলাকায় পানির ঘাটতি আছে, সেসব এলাকায় ঘাটতি সেচ এবং মাল্চ ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির অর্দ্রতা ধরে রাখা সম্ভব। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে যে, গাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি ও ফলনের জন্য পরিমিত সেচ এবং মাটির রস বজায় রাখার জন্য মাল্চ অপরিহার্য। পানির ঘাটতিজনিত কারণে ফসলের সংকটকাল পর্যায়ে এই প্রযুক্তির গুরুত¦ অপরিসীম। মাল্চ ব্যবহার করার ফলে শতকরা ২০ ভাগ পানি কম প্রয়োগ করেও অধিকতর ফলন পাওয়া সম্ভব। গম, সূর্যমুখী, সরিষা ইত্যাদিতে ঘাটতি সেচ এবং পেঁয়াজের বীজ ও করলা ইত্যাদি উৎপাদনে ঘাটতি সেচ এবং মাল্চ ব্যবহারের মাধ্যমে ফলন অধিকতর বৃদ্ধি এবং গুণগত মান বজায় থাকে। খরা প্রবণ এলাকায় এই প্রযুক্তি আরও অধিকতর কার্যকরী।

 

ফসলের বাষ্পীয় প্রস্বেদন সহগ (kc)

বিভিনড়ব ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা বিভিনড়ব রকমের হয়ে থাকে। ফসলের পানির চাহিদা মাটি, জলীয় বাস্প, শস্যের প্রকার, তাপমাত্রা, অঞ্চল। ইত্যাদিভেদে ভিনড়ব হয়ে থাকে। কোন সেচে কতটুকু পানি প্রয়োগ করতে হবে, তা নির্ভর করে ঐ সেচ হতে পরবর্তী সেচ পর্যন্ত শস্যের মোট কতটুকু পানির প্রয়োজন হয় তা নিচের সারণী ব্যবহার করে শস্যের প্রয়োজন অনুযায়ী পানির পরিমাণ নির্ণয় করা যায়।

 

প্রসেসিং আলু উৎপাদনে সেচ প্রযুক্তি

আলু উৎপাদনে সেচের গুরুত¦ অপরিসীম। বাংলাদেশে গমের পরেই প্রμিয়াজাতকরণ খাদ্য হিসাবে আলুর ব্যবহার μমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে রবি মৌসুমে আলুতে সেচ প্রয়োগ করলে ফলন কয়েক গুন বে—ে যায়। আলুর তিনটি সংবেদনশীল বৃদ্ধি পর্যায় (স্টোলন বের হওয়া পর্যায়, গুটি বের হওয়া পর্যায় এবং গুটি বৃদ্ধি পর্যায়) রয়েছে যে সময় সেচ একান্ত অপরিহার্য। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে যে, গাছের চাহিদা মোতাবেক মাটিতে উপযুক্ত সময়ে সঠিক পরিমাণ পানি প্রয়োগ করলে প্রসেসিং আলুর ফলন ও পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং খরচও কমে যায়। রবি মৌসুমে আলু উৎপাদনের জন্য প্রায় ২০-২৫ সে. মি. পানির প্রয়োজন হয়। পানির সুষ্ঠু ব্যবহারের ফলে প্রসেসিং আলুর গুণগত খাদ্যমান অর্থাৎ টিএসএস, ঘনত¦, এবং শর্করা ইত্যাদি বজায় থাকে।

 

সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা

সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা

We will be happy to hear your thoughts

Leave a Reply

শখের কৃষি
Logo
Reset Password
Shopping cart