মাসকলাই ও এর জাত

বাংলাদেশে মাসকলাই একটি গুরুত্বপূর্ণ আমিষ সমৃদ্ধ সুপাচ্য খাদ্য উপাদান। বাংলাদেশে প্রচলিত ডাল ফসলের মধ্যে মাসকলাইয়ের স্থান চতুর্থ। দেশে মোট উৎপাদিত ডালের ১০-১১% আসে মাসকলাই থেকে। দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাসকলাইয়ের চাষ বেশি হয়ে থাকে। দেশের উত্তরাঞ্চলের জন্য এটি একটি জনপ্রিয় ডাল। দেশে মাসকলাইয়ের মোট আবাদী জমির পরিমাণ প্রায় ৬৮ হাজার হেক্টর এবং উৎপাদন প্রায় ৬৩ হাজার মেট্রিক টন।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত মাসকলাইয়ের ৪টি উন্নত জাত হল বারি মাস-১ (পান্ত), বারি মাস-২ (শরৎ), বারি মাস-৩ (হেমন্ত) এবং বারি মাস-৪। বারি উদ্ভাবিত এ জাতসমূহ কৃষক পর্যায়ে আবাদ করে দেশে ডালের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব।

মাসকলাইয়ের জাত

বারি মাস-১ (পান্ত)

১৯৮১ সালে ভারত থেকে পান্ত ৩০ নামে মাসকলাইয়ের একটি অগ্রবর্তী লাইন আনা হয়। পরবর্তীতে বহুস্থানীক পরীক্ষার মাধ্যমে এ জাত উচ্চ ফলনশীল হিসেবে বিবেচিত হয় এবং ১৯৯০ সালে কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য বারি মাস-১ বা পান্ত নামে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে। গাছের উচ্চতা ৩২-৩৬ সেমি। এ জাতের বীজের রং কালচে বাদামী। বীজের আকার বড়। হাজার বীজের ওজন ৩৮-৪৩ গ্রাম। জাতটি দিবস নিরপেক্ষ হওয়ার ফলে খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুমে চাষ করা যায়। ডাল রান্না হওয়ার সময় কাল ৩০-৩৫ মিনিট। আমিষের পরিমাণ ২১-২৩%। জীবনকাল ৬৫-৭০দিন। ফলন হেক্টরপ্রতি ১৪০০-১৫০০ কেজি। এ জাত হলদে মোজাইক ভাইরাস রোগ সহনশীল।

বারি মাস-২ (শরৎ)

মাসকলাইয়ের এ জাতটি ১৯৮৭ সালে বিএমএ-২১৪১ এবং বিএমএ-২১৪০ অগ্রবর্তী লাইনের মধ্যে সংকরায়ণ করে উদ্ভাবন করা হয়। পরবর্তীতে প্রাথমিক, অগ্রগামী ও অঞ্চলভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে এ জাতটি দেশে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়। গাছের আকার মধ্যম। গাছের উচ্চতা ৩৩-৩৫ সেমি। স্থানীয় জাতের মত লতানো হয় না । পত্র ফলক মাঝারী সরু। পাকা ফলের রং কালচে, ফল খাড়া, ফলের গায়ে শুং আছে। বীজের রং কালচে। বীজের আকার স্থানীয় জাতের চেয়ে বেশ বড়। হাজার বীজের ওজন ৩২-৩৬ গ্রাম। রান্না হওয়ার সময়কাল ৩০-৩৫ মিনিট। আমিষের পরিমাণ ২১-২৪%। জীবনকাল ৬৫-৭০ দিন। ফলন হেক্টরপ্রতি ১৪০০-১৬০০কেজি। জাতটি দিবস নিরপেক্ষ এবং হলদে মোজাইক ভাইরাস রোগ সহনশীল।

বারি মাস-৩ (হেমন্ত)

মাসকলাইয়ের এ জাতটি ভারত হতে সংগৃহীত লাইন বিএমএ-২১৪০ এবং বিএমএ-২০৩৮ এর মধ্যে সংকরায়ণ প্রক্রিয়ায় উদ্ভাবন করা হয়। পরবর্তীতে অঞ্চলভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন করা হয়। গাছের আকার মধ্যম। গাছের উচ্চতা ৩৫-৩৮ সেমি। স্থানীয় জাতের মতো লতানো হয় না। ফল পাকলে কালো হয়। শুঁটিতে ঘন শুং আছে। বীজের রং কালচে। বীজের আকার স্থানীয় জাতের চেয়ে বড়। হাজার বীজের ওজন ৪০-৪৫ গ্রাম। রান্না হওয়ার সময়কাল ৩০-৩৭ মিনিট । আমিষের পরিমাণ ২১-২৪%। জীবনকাল ৬৫-৭০ দিন। ফলন হেক্টরপ্রতি ১৫০০-১৬০০ কেজি। এ জাত হলদে মোজাইক ভাইরাস রোগ সহনশীল।

বারি মাস-৪

প্রস্তাবিত লাইনটি ডাল গবেষণা কেন্দ্রে ২০০৭ সালে বারি মাস-২ ও  BBL 05016এর সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয়। পরবর্তীতে F3 ও F4  জেনারেশনে উক্ত কৌলিক সারিটি অগ্রায়িত করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে Pure line হিসেবে লাইনটিকে নির্বাচন করা হয়। এর পর ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জয়দেবপুর, যশোর, জামালপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, বরেন্দ্র ও পাবনা অঞ্চলে ফলন ও অভিযোজন ক্ষমতা, রোগ বালাই ও পোকা-মাকড় সংবেদনশীলতা এবং গুণগত মান মূল্যায়ন করা হয়। তন্মধ্যে এটি উচ্চফলনশীল এবং পোকা ও রোগ প্রতিরোধী লাইন হিসেবে নির্বাচন করা হয়। দীর্ঘদিন পরীক্ষার পর লাইনটি একটি সম্ভাবনাময় লাইন হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় জাত হিসেবে মুক্তায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয় এবং ২০১৭ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক বারি মাস-৪ হিসেবে অবমুক্ত করা হয়।

মাসকলাই জাতের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য

  • গাছ খাট আকৃতির (৪২-৪৬ সেমি)
  • পাতা সবুজ রঙের ও কা- খয়েরী পিগমেন্টেশনযুক্ত
  • বীজ কালচে বাদামী বর্ণের
  • পাউডারী মিলডিউ ও হলুদ মোজাইক রোগ সহনশীল
  • গাছে ফলের সংখ্যা বেশি (২৮-৩১টি)
  • তুলনামূলক বড় আকৃতির বীজ (১০০০ বীজের ওজন ৫০.৪-৫৪.০ গ্রাম)
  • জীবনকাল: ৬৯-৭৩ দিন
  • ফলন: ১২৫০-১৪৪০ কেজি/হেক্টর

সুত্রঃ কৃষি প্রযুক্তি হাতবই
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

We will be happy to hear your thoughts

Leave a Reply

শখের কৃষি
Logo
Reset Password
Shopping cart