মসুর ও মসুরের জাত


বাংলাদেশে মসুর সবচেয়ে জনপ্রিয় ডাল ফসল। জমির পরিমাণ ও উৎপাদনের ভিত্তিতে মসুর ডাল বাংলাদেশে ২য় স্থানে অবস্থান করলেও, ব্যবহার ও জনপ্রিয়তার দিক থেকে ১ম স্থান লাভ করে আছে। বাংলাদেশে ডাল ফসলের এলাকা ও উৎপাদনের দিক থেকে মসুরের স্থান দ্বিতীয়। মোট আবাদী এলাকা প্রায় ২.৪৯ লক্ষ হেক্টর এবং উৎপাদন প্রায় ২.৬৯ লক্ষ মে. টন এবং গড় ফলন প্রতি হেক্টর ১০৮০ কেজি।ডাল গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীগণ সংকরায়ণ ও প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতি অবলম্বন করে মসুরের জাত উদ্ভাবন কাজ করছেন। এছাড়া ICARDA হতে প্রাপ্ত লাইনসমূহ বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়াতে পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি প্রর্বতন করা হয়। তারপর কাক্সিক্ষত লাইনকে প্রাথমিক, অগ্রবতি, অঞ্চলভিত্তিক ও কৃষকের মাঠে মুল্যায়ন পরীক্ষার পর জাত হিসাবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়। এই পর্যন্ত ডাল গবেষণা

কেন্দ্র কর্তৃক ০৮টি উচ্চ ফলনশীল, রোগ সহনশীল ও পুষ্টিগুণ সম্পন্ন মসুরের জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত এসব জাত কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক আবাদ হলে দেশে ডালের চাহিদা অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব হবে। মসুর একদিকে একক ফসল এবং অন্যদিকে সাথী ও আন্তঃফসল হিসেবে বাংলাদেশের কৃষকের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মসুর চাষে জমির ঊর্বরতাও অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়।

মসুর

মসুরের জাত

বারি মসুর-১

বারি মসুর-১ জাত পাবনা এলাকার সংগৃহীত জার্মপ্লাজম থেকে উদ্ভাবন করা হয়েছে। ১৯৯১ সালে কৃষক পর্যায়ে আবাদের জন্য জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক এ জাতটি অনুমোদন লাভ করে। গাছের আকৃতি মধ্যম এবং উপরিভাগ লতানো হয় না ও ডগা বেশ সতেজ। গাছের পাতা গাঢ় সবুজ। কা- হালকা সবুজ। ফুলের রং সাদা। হাজার বীজের ওজন ১৫-১৬ গ্রাম। ডাল রান্না হওয়ার সময়কাল ১০-১২ মিনিট। আমিষের পরিমাণ ২৬-২৮%। এ জাতের জীবনকাল ১০৫-১১০ দিন। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৭০০-১৮০০ কেজি।

বারি মসুর-২

ইকার্ডা (ICARDA) থেকে ১৯৮৪ সালে এ লাইনটি বাংলাদেশে আনা হয়। এ লাইনটি বিভিন্ন এলাকায় প্রাথমিক, অগ্রবর্তী ও পরবর্তীতে বহুস্থানিক পরীক্ষার পর ১৯৯৩ সালে সারা দেশে আবাদের জন্য জাতটি অবমুক্ত করা হয়। গাছের আকার মধ্যম ও গাছের উপরিভাগ সামান্য লতানো হয়। পাতায় সরু আকর্ষী থাকে। গাছের পাতা গাঢ় সবুজ। কা- হালকা সবুজ ও ফুল সাদা। হাজার বীজের ওজন ১২-১৩ গ্রাম। রান্না হওয়ার সময়কাল ১৪-১৬ মিনিট। আমিষের পরিমাণ ২৭-২৯%। জাতটির জীবনকাল ১০৫-১১০ দিন। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৫০০-১৭০০ কেজি।

বারি মসুর-৩

বারিমসুর-৩ জাতটি একটি সংকর জাত। একটি স্থানীয় জাত এবং অগ্রবর্তী লাইনের (বিএলএক্স ৭৯৬৬৬) সাথে ১৯৮৫ সালে সংকরায়ণ করা হয়। পরবর্তীতে বহুস্থানিক ফলন পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাইকৃত এ জাতটি ১৯৯৬ সালে কৃষক পর্যায়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন করা হয়।

কান্ডে পিগমেন্টেশন বিদ্যমান। পাতার রং সবুজ। বীজের রং ধূসর এবং বীজে ছোট ছোট কালচে দাগ আছে। বীজের আকার স্থানীয় জাত অপেক্ষা বড়। হাজার বীজের ওজন ২২-২৫ গ্রাম। ডাল রান্না হওয়ার সময়কাল ১০-১২ মিনিট। আমিষের পরিমাণ ২৪-২৬%। জীবনকাল ১০০-১০৫ দিন। ফলন হেক্টরপ্রতি ১৫০০-১৭০০ কেজি।

বারি মসুর-৪

বারি মসুর-৪ জাতটি ১৯৮৫ সালে বারি মসুর-১ এবং ইকার্ডা থেকে প্রাপ্ত জাতের সাথে সংকরায়ণ করে ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়াতে পরীক্ষা করা হয়। পরবর্তীতে ফলন ও অন্যান্য গুণাবলী বিবেচনা করে এ লাইনটি (আইএলএক্স ৮৭২৪৭) সন্তোষজনক হওয়ায় উন্নত জাত হিসেবে চাষাবাদের জন্য ১৯৯৬ সালে অবমুক্ত করা হয়। গাছের রং হালকা সবুজ। পত্রফলক আকারে বড় এবং পাতার শীর্ষে আকর্ষী আছে। ফুলের রং বেগুনি। বীজের আকার স্থানীয় জাত হতে বড় ও চেপ্টা ধরনের। বীজের রং লালচে বাদামি। হাজার বীজের ওজন ২০-২১ গ্রাম। এ জাতটি মরিচা ও স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট রোগ সহনশীল। ডাল রান্না হওয়ার সময়কাল ১১-১৩ মিনিট। আমিষের পরিমাণ ২৪-২৬%। ফলন হেক্টরপ্রতি ১৬০০-১৭০০ কেজি।

বারি মসুর-৫

ইকার্ডা, সিরিয়া হতে সংকরায়িত লাইন থেকে প্রাপ্ত GX-3  পপুলেশন বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়াতে পরীক্ষা করা হয়। পরবর্তীতে ফলন ও অন্যান্য গুণাবলী যেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, আগাম পরিপক্কতা ইত্যাদি বিবেচনা করে ১৩টি লাইন বাছাই করা হয়। বাছাইকৃত এ সমস্ত লাইনগুলোকে দেশের ভিন্ন মসুর উৎপাদন এলাকায় প্রাথমিক, অগ্রবর্তী ও বহুস্থানীক ফলন পরীক্ষা করা হয়। কৃষকের জমিতে এ লাইনটি (এক্স-৯৫, এস-১৩৬) ফলন সন্তোষজনক বিবেচিত হওয়ায় উন্নতজাত হিসেবে নির্বাচন করা হয়।

এ লাইনটি ২০০৬ সালে বারি মসুর-৫ নামে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য

অনুমোদিত হয়। পাতা ও গাছের রং সবুজ, পাতার অগ্রভাগে ছোট আকারের টেন্ড্রিল থাকে। গাছের ধরন ঝোপালো, গাছের উচ্চতা ৩৮ সেমি এবং ফুলের রং হালকা বেগুনী, বীজ স্থানীয় জাত হতে বড় ও চেপ্টা ধরনের। বীজের রং লালচে বাদামী পরিপক্কতার সময় ১১০-১১৫ দিন। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ২১০০-২২০০ কেজি। এ জাতটি মরিচা ও স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট রোগ সহনশীল।

বারি মসুর-৬

২০০০ সালে ইকার্ডা সিরিয়া হতে সংগৃহীত সংকরায়িত লাইন থেকে প্রাপ্ত এফ-৩ পপুলেশন বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়াতে পরীক্ষা করা হয়। প্রাথমিকভাবে ৫৮ টি একক গাছ নির্বাচন করা হয়। পরর্তীতে ফলন ও অন্যান্য গুণাবলী যেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, আগাম পরিপক্কতা ইত্যাদি বিবেচনা করে ১১টি লাইন বাছাই করা হয়। বাছাইকৃত এ সমস্ত লাইনগুলোকে দেশের বিভিন্ন মসুর উৎপাদন এলাকায় প্রাথমিক, অগ্রবর্তী ও বহুস্থানীক ফলন পরীক্ষা করা হয়। কৃষকের

জমিতে এ লাইনটির [এক্স-৯৫, এস-১৬৭(৫)] ফলন সন্তোষজনক বিবেচিত হওয়ায় উন্নতজাত হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এ লাইনটি ২০০৬ সালে বারি মসুর-৬ নামে জতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য অনুমোদিতহয়। পাতার রং গাঢ় সবুজ,পাতার অগ্রভাগে টেন্ড্রিল থাকে না। গাছের ধরন ঝোপালো,উচ্চতা ৩৫-৪০ সেমি। ফুলের রং বেগুনী, বীজ আকারে স্থানীয় জাত হতে অনেক বড় ও চেপ্টা ধরনের। বীজের রং গাঢ় বাদামী, হেক্টরপ্রতি ফলন ২২০০-২৩০০ কেজি। পরিপক্কতার সময় ১১০-১১৫ দিন। এ জাতটি মরিচা ও স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট রোগ সহনশীল।

বারি মসুর-৭

ইকার্ডা, সিরিয়া হতে সংগৃহীত সংকরায়িত X955-16-4 লাইন থেকে প্রাপ্ত এফ-৩ পপুলেশন বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়ায় পরীক্ষা করা হয় এবং পরবর্তীতে ফলন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও পরিপক্কতা বিবেচনা করে বারি মসুর-৭ হিসেবে অবমুক্তির জন্য নির্বাচিত করা হয়। জাতটি বাংলাদেশের সকল এলাকায় চাষাবাদের উপযোগী বিশেষ করে মসুর উৎপাদন এলাকা যেমন-পাবনা, যশোর, কুষ্টিয়া,ফরিদপুর, রাজশাহী, মাগুরা,ঝিনাইদহ এবং মাদারীপুরে জাতটি অধিক উৎপাদনক্ষম। সব ধরণের

মাটিতেই জাতটি চাষ করা যেতে পারে। তবে সুনিষ্কাশিত বেলে দোঁআশ মাটিতে ভাল জন্মে। জমিতে পানি জমে না থাকলে কাঁদা মাটিতেও রিলে ফসল হিসাবে এর চাষ করা যেতে পারে। গাছের উচ্চতা ৩২-৩৮ সেমি। প্রতি গাছে পড সংখ্যা ৫৫-৬০টি। বীজের রং লালচে বাদামী ও হালকা কালো ফোঁটাযুক্ত। ১০০০ বীজের ওজন ২৩-২৫ গ্রাম। জীবনকাল ১১০-১১৫দিন। ফলন হেক্টর প্রতি ১৮০০-২৩০০ কেজি।

বারি মসুর-৮

কৌলিক সারি নং আইএলএল-৫৮৮৮ এবং আইএলএল-৬০০২। ইকারডা ICARDA সিরিয়াতে উক্ত কৌলিক সারিগুলো সংকরায়ণের ফলে জিংক ও আয়রন সমৃদ্ধ এলআর-৯-২৫ লাইনটি উদ্ভাবিত হয়। ২০০৭ সাল হতে আর্ন্তজাতিক সংস্থা ইকার্ডা কর্তৃক প্রাপ্ত এলআর-৯-২৫ লাইনটি

বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়াতে পরীক্ষা করা হয়। এই লাইনটি উচ্চফলনশীল এবং মরিচা ও

স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট (পাতা ঝলসানো) রোগ সহনশীল এবং সর্বোপরি উচ্চ আয়রন ও জিংক সমৃদ্ধ হওয়ায় প্রাথমিকভাবে লাইনটিকে নির্বাচন করা হয়। বাছাইকৃত ঐ লাইনটিকে প্রাথমিক, অগ্রবর্তি, অঞ্চলভিত্তিক ও কৃষকের মাঠে মুল্যায়ন পরীক্ষার পর জাত হিসাবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয় এবং ২০১৫ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন দেয়।

এ জাতটির পাতা ও কান্ড হালকা সবুজ এবং পাতায় হালকা ট্রেন্ড্রিলযুক্ত। গাছ ঝোপালো আকৃতির এব ফুলের রং বেগুনী। গাছের গোড়ায় খয়েরী পিগমেন্ট বিদ্যমান। বীজ গোলাকার, ধূসর ও হালকা কালো ফোটা যুক্ত। ষ্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট (পাতা ঝলসানো) রোগ প্রতিরোধী। আমিষের পরিমাণ ২৪.০ – ২৪.৯ %। জিংক এর পরিমাণ ৬০ পিপিএম। আয়রন এর পরিমাণ ৮০ পিপিএম। ১০০০ টি বীজের ওজন ১৯-২২ গ্রাম। জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন। ফলন হেক্টর প্রতি ২১০০-২২০০ কেজি। নাবিতে বপন যোগ্য (নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত)

সুত্রঃ কৃষি প্রযুক্তি হাতবই
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট



Tags:

We will be happy to hear your thoughts

Leave a Reply

শখের কৃষি
Logo
Reset Password
Shopping cart