Editor choice

ভ্যানিলা ভাইন, ভ্যানিলা ফ্লেভার

ভ্যানিলা ফ্লেভার আইস্ক্রিম খেয়েছেন তো, আসুন জেনে নেই কোথা হতে আসে সেই ভ্যানিলা 
********অমূল্য ভ্যানিলা ভাইন************

.
লতানো অর্কিড। ফুলগুলো ভোরবেলা ফোটে আর দুপুর গড়াতেই চুপসে যায়। সকাল থেকে কর্মীদের ভিড় লেগে যায় শেড-করা বাগানে। ফুলের সাথে মানুষের দেখা হতেই হবে, নইলে মেহনতি মানুষের বেঁচে থাকা দায়। সবার পকেটে টুথপিক। টুথপিক ছাড়া এই ফুলের পরাগায়ন করা সহজ নয়। আজব এক ফুল, যার পরাগধানী আর গর্ভমুণ্ডের মাঝখানে ঠোঁটসদৃশ এক পর্দা (Rostellum)। এই পর্দা ভেদ করে পরাগের সঙ্গে গর্ভমুণ্ডের সাক্ষাৎ হয় না। তাই পর্দাটাকে টুথপিক দিয়ে সরিয়ে নিয়ে মৃদু চাপ দিতে পারলে পরাগ লেগে যায় গর্ভমুণ্ডে। কাজটি করতে হয় নিপুণতার সাথে কারণ পরাগের সংখ্যা থাকে সামান্য, একবার মিস্‌ করলে দ্বিতীয় সুযোগ কম। পরাগায়নের ফলে ফল ধরে অর্কিড গাছে, ভ্যানিলা পড্‌।

ফল পরিপূর্ণভাবে লম্বা হতে দেড়মাস সময় লাগে কিন্তু পুষ্ট হতে লাগে ৬ মাস। ফলের রং হলদে হয়ে গেলে এবং মাথা একটু ফেটে গেলেই বোঝা যায়, ফল পুষ্ট হয়েছে। এরপর গরম পানিতে চুবিয়ে শুকানোর পালা। সকালে দুই ঘন্টা রোদে দিয়ে আবার কাপড়ে গুটিয়ে ঘরে তোলা হয় প্রতিদিন। এভাবে দেড়মাস অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ফলগুলো দেখতে হয় বাদামি রঙের, গাত্র সজিনার মতো রেখাযুক্ত, যা প্রথমাবস্থায় থাকে বরবটির মতো, ১৫-২০ সেন্টি লম্বা। লম্বা ফলের মূল্য বেশি। এই শুকনো ফল বাজারে বিক্রি হবে। এলকোহলের ভিতর এই ফল আর সূক্ষ্ম কালো বীজ ডুবিয়ে রেখে দিলে ছমাস পরে তৈরি হবে ‘ভ্যানিলা এক্সট্রাকট্‌, যা থেকে বের হবে ভুরভুরে ভ্যানিলার ঘ্রাণ। ফল থেকে আরো তৈরি হবে এসেন্স, ভ্যানিলা পেস্ট ইত্যাদি যা প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহার করা হবে আইসক্রিম, কেক, ইয়োগার্ট, বিস্কুটসহ নিদেনপক্ষে ১৮০০০ জিনিসের ভিতর।

মাছ-মাংস সব্জি যে-কোনো খাবারে কয়েকফোঁটা ভ্যানিলা এক্সট্রাকট্‌ দিলে ঘ্রাণটা বেশ খুলে যায়। তবে রান্নার জন্য আস্ত ফল কেটে টুকরো করেও দেয়া যায়। টমেটোর অম্বল বেশি টক মনে হলে তাতে ভ্যানিলার ফোঁটা দিলে টক কমে যায়। আর শুধু খাবারে নয়, পেইন্ট, ক্লিনিং প্রোডাক্ট, টায়ার ইত্যাদির নানারকম বোঁটকাগন্ধ দূরীকরণে, পারফিউমে ও এরোমাথেরাপিতে এর ব্যবহার আছে। নিউইয়র্কের একটি ক্যান্সার হাসপাতালের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, এমআরআই (Magnetic Resonance Imaging) ও সিটি স্ক্যান (Computerized Tomography Scan) করার আগে ভ্যানিলাসমৃদ্ধ কিছু খেয়ে নিলে রোগীর মানসিক চাপ কম থাকে অনেক। যাদের এরাক্‌নোফোবিয়া (Aracnophobia) আছে অর্থাৎ মাকড় দেখে ভয়ে টুলুমুলু অবস্থা হয়, তাদের ঘরে ভ্যানিলা এক্সট্রাক্ট বা এসেন্স খুলে রাখলে মাকড় পালিয়ে যায়।

শ্রমনির্ভরতার কারণে ভ্যানিলা-জাত দ্রব্যের উৎপাদনমূল্য বেড়ে যায় অনেক, যেমনটা দেখা যায় জাফরানে। জাফরান চাষে রাত জেগে কন্দভুক ইঁদুর তাড়িয়ে গাছ বড় করতে পারলে একটি গাছে ফুল ধরে চারটি। একেকটি ফুল থেকে লাল-কমলা রঙের তিনফালি গর্ভমুণ্ড সংগ্রহ করতে হয় হাতে। শুকানোর পরে এগুলো এত হালকা হয়ে যায় যে আধা কিলো জাফরান তৈরি করতে দরকার হয় ৮০ হাজার ফুল, বাজারে যার মূল্য সোনার চেয়েও বেশি। জাফরানের পরে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভ্যানিলা এক্সট্রাক্‌টের দাম, খুচরো বাজারে এখন কিলোপ্রতি ৪০০ ডলার, কয়েক বছর আগেও যা ছিল ২৫ ডলার। বৈরি আবহাওয়া ছাড়াও মার্কেটিং পলিসির কারণে ভ্যানিলার দাম এখন তুঙ্গে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। অস্বাভাবিক মূল্যের কারণে এখন তৈরি হচ্ছে সস্তা কৃত্রিম ভ্যানিলা যার উপাদান একই ভ্যানিলিন, যা থাকে ভ্যানিলা ফলের ভিতর।

এখন আর মানুষ সহজে আগের মতো রান্নাঘরে আসল ভ্যানিলা ব্যবহার করতে পারে না। খুব ভাল কোম্পানির আইসক্রিম অবশ্য এখনো তৈরি হয় অরিজিনাল ভ্যানিলা দিয়ে কারণ আসল ভ্যানিলিন ছাড়া আইসক্রিম সুস্বাদু হয় না। কৃত্রিম ভ্যানিলিন তৈরি হয়, পেট্রোলিয়াম, লবঙ্গ তেল, চালের তুষ, ঝাউয়ের বাকল এবং কাঠ থেকে, যে-কাঠ সংগৃহীত হয় পেপার মিলের উদবৃত্ত মণ্ড বা পালপ্‌ থেকে। এগুলো সবই প্রাকৃতিক দ্রব্য। মেক্সিকোতে এক সময় নকল হিসাবে তঙ্কা শিম (Tonka beans) ব্যবহার করা হতো যার ঘ্রাণ ভ্যানিলার খুব কাছাকাছি। তঙ্কার ভিতরে থাকে ‘কুমারিন বিষ’ যা ব্যবহারের কারণে মানুষের কিডনি ও লিভারের সমস্যা দেখা দেওয়াতে আমেরিকার এফডিএ (Food and Drug Administration) এই শিম ব্যবহার বাজেয়াপ্ত করেছে। যাহোক, আমাদের ভ্যানিলিন তৈরি করা নিয়ে কথা, স্বাস্থ্যের জন্য তা ক্ষতিকর না হলেই হলো। প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ভ্যানিলার মধ্যে ঘ্রাণে তেমন একটা তফাৎ নেই। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়, কৃত্রিম ভ্যানিলা দিয়ে বানানো কুকিজ-এর (Cookies) স্বাদ যেন একটু বেশিই। ভ্যানিলার একটি বৈশিষ্ট্য হলো, সূক্ষ্ম বিচারে এর প্রতিটি গাছই ভিন্ন, প্রতিটি গাছের ভ্যানিলার স্বাদ একটু হলেও আলাদা। একই প্রজাতির গাছ বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নরকম স্বাদের হতে পারে আবহাওয়া ও মাটির কারণে।

প্রকৃতিতে এই ভ্যানিলা ফুলের পরাগায়ন করতো এক ধরনের ক্ষুদে মৌমাছি, মেলিপোনা (Melipona) যা কেবল মেক্সিকোতেই দেখা যেত। এদের হুল নেই, দেখে মনে হয় মাছি, অথচ মৌমাছি। এরাই কেবল ভ্যানিলা ফুলের বিভাজন পর্দা (Rostellum) সরিয়ে মধু খাওয়ার সময় পরাগ মাখতে পারে গায়ে। এমতাবস্থায় অন্য ফুলে উড়ে গেলে সেই ফুলে পরাগায়ন হয় যা Cross pollination বা পরপরাগায়ন। স্বপরাগায়নে ভ্যানিলার বীজ অঙ্কুরোদ্গমক্ষম হতে পারে না। মেক্সিকোর বাইরে দীর্ঘ ৩০০ বছর ধরে মানুষ বহু ব্যর্থ চেষ্টা করেছে এদের পরাগায়ন করার; মৌমাছিকে ধরে নিয়ে গেছে ইউরোপে, যেখানে গাছ আছে, ফুল আছে কিন্তু ফল ধরে না। এই গাছগুলো সেখানে ছিল ল্যান্ডস্কেপের উপাদান হিসাবে, লম্বা গাছ বেয়ে উঠে যাওয়া দৃষ্টিনন্দন ফুল ও লতাপাতার সৌন্দর্যে। ঠিক কী কারণে মেলিপোনা মৌমাছি ভীষণভাবে কমে গিয়ে ভ্যানিলার পরাগায়ন-সঙ্কট সৃষ্টি করেছে তা আবিষ্কার করা দুরূহ। তবে অনুমিত হয়, মেক্সিকোতে নতুন আমদানি করা মৌমাছি ক্ষুদে মৌমাছিদের খাদ্য ও আস্তানা দখল করে নেয়ার ফলেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কোণঠাসা এই ক্ষুদে মৌমাছি থেকে প্রস্তুত মধুর পরিমাণ কম, কিন্তু স্বাদ অনেক বেশি, ঔষুধিগুণও। এখন সারা পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছে আর আমরা নিরূপায়ভাবে কোয়ালিটির পরিবর্তে কোয়ান্টিটিতে মনোযোগী হতে বাধ্য হচ্ছি।

মাদাগাস্কারের পূবে আছে ফরাসী অধিকৃত বুরবন দ্বীপ। ১৮৪১ সালে সে দ্বীপের এক বাচ্চা ক্রীতদাস কাঠি দিয়ে এই ফুলের পরাগায়ন ঘটিয়ে ফেললো। আর এর পর থেকেই শুরু হলো হাতে হাতে পরাগায়ন। এই বুরবন দ্বীপে অর্থাৎ ‘রিইউনিয়ন’ দ্বীপেই সারা পৃথিবীর তিন চতুর্থাংশ ভ্যানিলা উৎপাদিত হয় যার বৈজ্ঞানিক নাম ভ্যানিলা প্লানিফোলিয়া (Vanilla planifolia)। এই প্রজাতি থেকেই উৎকৃষ্ট ঘ্রাণের ভ্যানিলা তৈরি হয়, যা মাদাগাস্কার ছাড়া ইন্দোনেশিয়াতেও চাষ হয়। বাকি দুই প্রজাতির মধ্যে আছে ভ্যানিলা তাহিতেনসিস্‌ (Vanilla tahitensis) যার চাষ হয় দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ও ভ্যানিলা পমপোনা (Vanilla pompona) দেখা যায় দক্ষিণ আমেরিকায়। এই ভ্যানিলা পমপোনা সম্ভবত প্লানিফোলিয়া ও অডোরটা প্রজাতির সঙ্কর। অর্কিড পরিবারে প্রায় ৩০,০০০ প্রজাতি আছে যার মধ্যে ভ্যানিলা গণে ১১০টি। বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মেক্সিকোই ছিল ভ্যানিলার প্রধান উৎপাদনকারী দেশ এখন যা দেখা যায় ইন্দোনেশিয়া ও মাদাগাস্কারে। বর্তমানে ভ্যানিলা উৎপাদনে আরো যে কয়েকটি দেশ অংশগ্রহণ করছে তাদের মধ্যে রয়েছে পাপুয়া নিউ গিনি, কস্টা রিকা, উগান্ডা, তঙ্গা, ফিজি, চীন, ফিলিপাইন ও ভারত। পৃথিবীর দুটি দেশ, আমেরিকা ও ফ্রান্স ভ্যানিলার সবচেয়ে বড় খরিদ্দার হলেও ইউরোপের সব দেশেই এর চাহিদা খুব বেশি।

ভারতের কেরালা ও কর্ণাটক এলাকায় ভ্যানিলার চাষ হয়, উৎপাদনের পরিমাণও নগণ্য নয়। এই চাষ বাংলাদেশেও সম্ভব। ভ্যানিলার চাষ ভাল হয় ১০ থেকে ২০ ডিগ্রি উত্তর বা দক্ষিণ অক্ষাংশে, উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে। এদের শীতসহিষ্ণুতা কম, অতিরিক্ত তাপও ক্ষতিকর। এ কারণে উল্লিখিত অক্ষাংশের বাইরে চাষ করতে হলে গ্রিনহাউস প্রয়োজন হয়। সাধারণ সার, নারকেলের ছোবড়া, খৈল, পোল্ট্রি সার, ছাই ইত্যাদি ভ্যানিলা চাষের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। গাছের গোড়ায় জল যাতে না জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বীজ থেকে এই অর্কিডের চারা উৎপাদনে মাইকোরাইজা (Mycorrhiza) ফাঙ্গাস দরকার হয়, আবার টিস্যু কালচারও ঝামেলাকর। ভ্যানিলা গাছের কাণ্ড থেকেই নতুন চারা উৎপাদন করা সহজ। পুষ্পবিহীন এক মিটার লম্বা ডাঁটার পাতা কমিয়ে দিয়ে গোড়াটা এমনভাবে মাটিতে পুঁততে হবে যাতে কাণ্ডসন্ধিটা মাটি ছুঁয়ে থাকে। এতে শিকড় বের হতে সুবিধা হয়, পুরো কাণ্ড মাটির নিচে চাপা দিতে হয় না। কাণ্ডের অন্যপ্রান্ত আশ্রয়দাতা গাছের সঙ্গে কলাগাছের ফাত্‌রা বা পাটের আঁশ দিয়ে বেঁধে দিলেই চলে। এতেই পরাশ্রয়ী ভ্যানিলা গাছ সহজে বেড়ে উঠতে পারে।

ভ্যানিলা চাষের জন্য বড় রকমের মাচা বা ট্রেলিসের দরকার হয় না। মূলত যে-কোনো গাছে বাইয়ে দিলেই হলো। তবে সে-ক্ষেত্রে একটি সমস্যা সৃষ্টি হয়, কারণ ভ্যানিলা-লতা আঁকাবাঁকাভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে ক্রমাগত উপরে উঠতে থাকে গাছ বেয়ে; এবং এভাবে নারকেল, ইপিল-ইপিল, কড়ই ইত্যাদি গাছের মাথায়ও উঠে যেতে পারে। কিন্তু বেশি উঁচু অবস্থানে হাতের নাগালের বাইরে ফুল ফুটলে সেগুলোর ম্যানুয়াল পরাগায়ন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য হাতের উচ্চতার বাইরে গেলে এদের খড়-নাড়া কাঁড়ালি অথবা ফল-পাড়া কোঁটা দিয়ে উঁচু জায়গা থেকে নামিয়ে নিচের দিকে ভাঁজ করে দিতে হবে। এতে একটা সুবিধাও হবে, স্ট্রেসের কারণে ফুল বেশি ফুটবে গাছে। যথারীতি পরাগায়ন করতে পারলে, সেই ফুল থেকে নেমে আসবে অনেক ভ্যানিলা ফল, যার একটির দাম দুর্মূল্যের বাজারে ২ ডলার।

ভ্যানিলা উৎপাদনে মানুষের আর্থিক লাভ হলেও তাতে কিছু দৈহিক ও মানসিক কষ্ট আছে। আগে প্রকৃতির প্রাণীরা যে সুষ্ঠু পরাগায়ন করত তাদের সংখ্যা মানুষের কারণেই দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং মানুষ তার জায়গায় পতঙ্গের কাজ শুরু করেছে। মেক্সিকোতে মেলিপোনা মৌমাছিদের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করছে ‘মেলিপোনা মায়া ফাউন্ডেশন’ ও আরেকটি সাড়া জাগানো নারী সংস্থা ‘কুওলিল ক্যাব কালেক্টিভ’। এই দুটো সংস্থার নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা অক্লান্তভাবে কাজ করছেন, জীবনের অনেক সময় উৎসর্গ করছেন; মৌচাক থেকে সৃষ্ট মধু, মোম ও ওষুধ বিক্রি করে সংস্থার মানব হিতৈষী কার্যক্রম চালু রাখছেন। আমরা, যাবতীয় প্রকৃতিপ্রেমীরা তাঁদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা অনুভব করি।

We will be happy to hear your thoughts

      Leave a Reply

      Logo
      Reset Password
      Compare items
      • Total (0)
      Compare
      0