বারি লিচু-৪

বারি লিচু-৪

বৈশিষ্ট্য : মাঝ-মৌসুমী অতি ক্ষুদ্র বীজ সম্পন্ন লিচুর একটি উচ্চ ফলনশীল এবং উন্নত গুণগত মানসম্পন্ন জাত। মধ্য মাঘে গাছে ফুল আসে এবং জ্যৈষ্ঠের শেষ সপ্তাহে ফল আহরণ উপযোগী হয়। পাকা ফলের রংউজ্জল লাল। ফলের গড় ওজন ২৭ গ্রাম, ফল বেশী মাংসল, রসালো ও খুব মিষ্টি (ব্রিক্সমান ২২.০%
উপযোগী এলাকা  : বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের (রংপুর, দিনাজপুর) জন্য উপযোগী।
বপনের সময়  : মে থেকে জুন মাস লিচুর কলম রোপরেণ উপযুক্ত সময়। তবে বর্ষার শেষ দিকে অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিন (মধ্য সেপ্টেমবর থেকে মধ্য অক্টোবর) মাসেওলিচুর কলম রোপণ করাযায়।
মাড়াইয়ের সময়:  জ্যৈষ্ঠের শেষ সপ্তাহে ফল আহরণ উপযোগী হয়।
ফলন: গাছ প্রতি ফল ১৩০ কেজি। হেক্টর প্রতি ফলন ৫-৬ টন।

 রোগবালাই ও দমন ব্যবস্থা

 রোগবালাই: 
পাউডারী মিলডিউঃ এ রোগের আক্রমণে লিচুর মুকুলে সাদা বা ধূসর বর্ণের পাউডারের আবরণ দেখা যায়। আক্রান্ত মুকুল নষ্ট হয় ও ঝরে পড়ে।
ফল ফেটে যাওয়াঃ বাড়ন্ত ফলের ত্বক ঝলসে যাওয়া এবং ফেটে যাওয়া লিচুর একটি মারাত্বক সমস্যা। উচ্চ তাপমাত্রা, নিম্ন আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং মাটিতে রসের ঘাটতি থাকলে এ সমস্যা বেশী হয়। দীর্ঘ খরার পর হঠাৎ অধিক বৃষ্টি হলে এ সমস্যা মারাত্বক আকার ধারণ করে। জাত ভেদেও খোসা ঝলসে যাওয়া ও ফল ফেটে যাওয়া সমস্যার তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। ক্যালসিয়াম ও বোরনের অভাবেও ফল ফাটার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
ফল ঝরাঃ লিচুতে প্রাথমিক ফল ধারণ হার অনেক বেশী হলেও ফল ঝরে যাওয়ার দরুণ শেষ পর্যন্ত খুব কম পরিপক্ক ফল আহরণ করা সম্ভব হয়। ধরার পর থেকে শুরু করে পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত ফল ঝরা চলতে থাকে। ফল ধরার ২-৪ সপ্তাহ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ফল ঝরে। মাটিতে রসের অভাব, অতি উচ্চ তাপমাত্রা ও ফলছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ ফল ঝরার প্রধান কারণ।
 দমন ব্যবস্থা: 
পাউডারী মিলডিউ প্রতিকার : গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগে একবার এবং একমাস পর আর একবার টিল্ট ২৫০ ইসি নামক ছত্রাক নাশক প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলিলিটার অথবা কুমুলাক্স/সালফোলাক/ম্যাগসালফার প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
ফল ফেটে যাওয়া প্রতিকারঃ ফলের বাড়ন্ত অবস্থায় নিয়মিত সেচ দিতে হবে। ধান, গম বা ডাল জাতীয় ফসলের খড় দ্বারা মালচিং করতে হবে।
ফল ঝরাঃ প্রতিকারঃ নিয়মিত পরিমিত পরিমাণ সার ও সেচ প্রদান এবং ধান, গম অথবা ডাল জাতীয় ফসলের খড় দ্বারা মালচিং করতে হবে। ফলছিদ্রকারী পোকা দমন করতে হবে।

 পোকামাকড় ও দমন ব্যবস্থা

 পোকামাকড়: 
ফল ছিদ্রকারী পোকাঃ ফল ছিদ্রকারী পোকা লিচুর অন্যতম প্রধান শত্রু। ফলের বাড়ন্ত অবস্থায় পূর্ণ বয়স্ক পোকা ফলের বোঁটার কাছে খোসার নীচে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে বোঁটার নিকট দিয়ে ফলের ভিতরে ঢুকে বীজ খেতে থাকে। এতে অনেক অপরিপক্ক ও পরিপক্ক ফল ঝরে যায়। এছাড়া বীজ খাওয়ার দরুণ করাতের গুড়ার মত পদার্থ উৎপন্ন হয় এবং বোঁটার কাছে জমে থাকে। এতে ফল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং বাজার মূল্য হ্রাস পায়।
লিচুর মাইট বা মাকড়ঃ লিচু গাছের পাতা, ফুল ও ফলে এর আক্রমণ দেখা যায়। আক্রান্ত পাতা কুঁকড়িয়ে যায় এবং এর নীচের দিকে লাল মখমলের মত হয়ে যায় এবং দুর্বল হয়ে মরে যায়। আক্রামত ডালে ফুল, ফল বা নতুন পাতা হয় না এবং আক্রান্ত ফুলে ফল হয় না।
লিচু গাছের মাজরা পোকাঃ এই পোকার কীড়া লিচু গাছের কান্ড ছিদ্র করে ভিতরে প্রবেশ করে। আক্রান্ত অংশ রেশমি পর্দা দিয়ে সম্পূর্ণ ঢাকা থাকে। এরা ছাল খাওয়া শেষ করে পরবর্তীকালে কান্ড খেতেথাকে। অতি মাত্রায় আক্রান্ত হলে গাছের প্রাণরস সঞ্চালনে বাধার সৃষ্টি হয় এবং গাছের সজীবতা হ্রাস পায়। চারাগাছ আক্রান্ত হলে গাছ মারাও যেতে পারে।
বাদুরঃ লিচুর প্রধান শত্রু বাদুর। এরা পরিপক্ক ফলে আক্রমণ করে। ফল বৃদ্ধিপ্রাপ্ত অবস্থায় এক রাতের অসাবধানতায় এরা সমস্ত ফল বিনষ্ট করে ফেলতে পারে। মেঘলা রাতে বাদুরের উপদ্রব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
 দমন ব্যবস্থা: 
ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনব্যবস্থাঃ বাগান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আক্রান্ত ফল বাগান থেকে কুড়িয়ে মাটির গভীরে পুঁতে ফেলতে হবে। এ পোকা দমনের জন্য রিপকর্ড/সিমবুশ/সুমিসাইডিন /ডেসিস প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে ফলের মার্বেল অবস্থা থেকে শুরু করে ১৫ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে ফল সংগ্রহের অন্তত ১৫ দিন পূর্বে শেষ স্প্রে করতে হবে।
লিচুর মাইট বা মাকড় দমন ব্যবস্থাঃ ফল সংগ্রহের সময় মাকড় আক্রামত পাতা ডালসহ ভেঙ্গে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। মাকড় নাশক ভারটিম্যাক প্রতি লিটার পানিতে ১ মি.লি. পরিমাণ মিশিয়ে নতুন পাতায় ১৫ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
লিচু গাছের মাজরা পোকা দমন ব্যবস্থা আক্রমণ দেখা গেলে কীড়ার তৈরি ছিদ্র পথে সুচালো আগাযুক্ত লোহার শিক ঢুকিয়ে ভিতরে লুকিয়ে থাকা কীড়া মারতে হবে। আক্রমণের মাত্রা বেশী হলে আক্রান্ত অংশ পরিস্কার করে এক খন্ড তুলা পেট্রোল, কেরসিন, ক্লোরফর্ম ইত্যাদিতে ভিজিয়ে গর্তের ভিতরে ঢুকিয়ে ছিদ্রপথ কাদামাটি দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে।
বাদুর দমন ব্যবস্থাঃ বাদুর তাড়ানোর জন্য রাতে পাহাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সমস্ত গাছ জালের সাহায্যে ঢেকে দিয়েও বাদুরের আক্রমণ রোধ করা যায়। বাগানে গাছের উপর দিয়ে শক্ত ও চিকন সুতা বা তার টাঙ্গিয়ে রাখলে বাদুরের চলাচল বাঁধাগ্রস্থ হয়।

 সার ব্যবস্থাপনা

সারের নাম গাছের বয়স(বছর)
১-৪ ৫-১০ ১১-২০ ২০ এর উর্ধ্বে
গোবর (কেজি) ১০ ২০ ৩০ ৫০
ইউরিয়া (গ্রাম) ৩০০ ৮০০ ১২০০ ২০০০
টিএসপি (গ্রাম) ৪০০ ১২০০ ২০০০ ৩০০০
এমওপি(গ্রাম) ৩০০ ৮০০ ১২০০ ১৫০০
জিপসাম (গ্রাম) ১০০ ২০০ ২৫০ ৩০০
জিংক সালফেট(গ্রাম) ১০ ২০ ৩০ ৫০

প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন।

We will be happy to hear your thoughts

Leave a Reply

শখের কৃষি
Logo
Reset Password
Shopping cart