বাংলাদেশে ইক্ষু বা আঁখ চাষের গুরুত্ব, সমস্যা ও সম্ভাবনা।

বাংলাদেশের মাটি, আবহাওয়া ও জলবায়ু ফসল উৎপাদনের জন্য বিশেষ উপযোগী। তাই কৃষিই এ দেশের মানুষের প্রধান পেশা। বাংলাদেশে অর্থকরী ফসলের মধ্যে ইক্ষু অন্যতম। চিনি ও গুড় উৎপাদনের প্রধান ফসল ইক্ষু। খেজুর গাছের রস থেকেও যথেষ্ট পরিমান গুড় উৎপাদন হয়। এছাড়া তাল, গোলপাতা ইত্যাদি থেকেও গুড় উৎপাদন হয় যা অতি নগন্য। বাংলাদেশে যে চিনি ও গুড় উৎপাদন হয় তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা কর্তৃক বাংলাদেশের মানুষের জন্য বার্ষিক মাথাপিছু ১৩ (তের) কেজি চিনি গ্রহণের জন্য সুপারিশ করেছেন। সে হিসেবে বাংলাদেশের ১৪ কোটি মানুষের জন্য ১৮ লক্ষ টন চিনি প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ইক্ষু বা আঁখ

বাংলাদেশের ইক্ষু বা আঁখ

বিশ্বে প্রধানত: ইক্ষু, ম্যাপল, তাল খেজুর এবং গোলপাতাসহ ৬ টি ফসল/ উদ্ভিদ থেকে চিনি /গুড় উৎপাদিত হয় যা মিস্টিকারক ফসল হিসাবে পরিগণিত। বিশের মোট চিনির ৭০% চিনি উ্ৎপাদিত হয় ইক্ষু হতে এবং বাকী ৩০% উৎপাদিত হয় সুগারবিট হতে। একজন পূর্ণবয়¯‥ মানুষের মস্তি¯ে‥র সুষ্ঠ কার্যকারীতা সচল রাখার জন্য প্রতি মিনিটে প্রতি ১০০ গ্রাম ব্রেনের জন্য ৭৭.০ মিলিগ্রাম গ্লুকোজের প্রয়োজন। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ঋঅঙ) এর অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৬৩.৬৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার জন্য চিনি/গুড়ের চাহিদা ২১.২৭ লক্ষ টন । কিন্তু বর্তমানে দেশে ৬ লক্ষ টন চিনি ও গুড় (১.০ লক্ষ টন চিনি এবং ৪ লক্ষ টন আখের গুড় এবং ১ লক্ষ টন তাল খেজুরের গুড় ) উৎপাদিত হচ্ছে । বাকী ১৫-১৬ লক্ষ টন চিনির ঘাটতি মেটানো হয় বিদেশ হতে রিফাইন্ড/ ‘র’ সুগার এর মাধ্যমে। ২০১২-১৩ সালে ২১.২৭ লক্ষ টন চিনি/গুড় চাহিদার বিপরীতে ৫ লক্ষ টন চিনি/গুড় দেশীয় ভাবে উৎপাদি এবং
১৫.৫০ লক্ষ টন আমদানীর মাধ্যমে চাহিদা মেটানোর পরেও বাকী ১.১৮ লক্ষ টন চিনির ঘাটতি রয়ে যায়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ইক্ষুর গড় ফলন কম। বর্তমানে বাংলাদেশে হেক্টর প্রতি গড় ফলন ৫০ টন। ফলন কম হওয়ার প্রধান কারন রোগমুক্ত বিশুদ্ধ বীজের অভাব। গবেষণায় দেখা গেছে বিশুদ্ধ বীজের অভাবে আখের ফলন শতকরা ৩০- ৪০ ভাগ হ্রাস পায়। সেই হিসাবে ১৪০৩৬০ হে. জমিতে মোট ২১০৫৪০০ মে. টন আখ কম উৎপাদিত হয়। যার ফলশ্রƒতিতে, বিশুদ্ধ বীজের অভাবে একই পরিমান জমিতে বছরে ১৪৭৩৮০ মে. টন চিনি উৎপাদন হ্রাস পায়।

বাংলাদেশে যে সমস্ত ইক্ষুজাত এবং ইক্ষু উৎপাদন প্রযুক্তি রয়েছে এগুলোকে ব্যবহার করেই বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের জমিতে হেক্টর প্রতি ১৪৮ Ñ ২৪৭ টন পযন্ত ফলন পাওয়া গিয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে বর্তমান ইক্ষু জাত এবং ইক্ষু উৎপাদন প্রযুক্তিসমূহ মাঠে প্রয়োগ করে ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব। তবে ফলন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন ১) বর্ষায় জলাবদ্ধতা হয় না এমন জমিতে ইক্ষু চাষ ২) অনুমোদিত ইক্ষুজাত ব্যবহার ৩) আগাম রোপণ ৪) অনুমোদিত মাত্রায় সার গ্রয়োগ ৫) পদ্ধতিগত ভাবে সাথীফসল চাষ ৬) প্রয়োজনে পানি সেচের/নি®‥াশনের ব্যবস্থা করা ৭) যথাযথ পরিচর্যা করা ৮) যথাযথ ভাবে রোগ ও পোকা দমনের ব্যবস্থা করা। এ কয়টি বিষয়ে একটু সজাগ দৃষ্টি রাখলেই ইক্ষুর ফলন হেক্টর প্রতি ৬০/ ৭০ টন পাওয়া তেমন কোন কঠিন নয়।

বাংলাদেশে চিনির আহরণ হার ৮% এর নীচে। চিনির আহরণ হার ৮.৫% Ñ ৯.০% করতে পারলে চিনির মূল্য কেজি প্রতি ৩২Ñ৩৬ টাকায় রাখা সম্ভব হবে। এর জন্য প্রয়োজন বর্ষায় পানি জমে না এরকম জমিতে ইক্ষু চাষ, উচ্চ চিনিযুক্ত ইক্ষু জাতের চাষ।

বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত ইক্ষুুজাত এবং ইক্ষু উৎপাদন প্রযুক্তিসমূহ চিনিকল এলাকায় কিছুটা বিস্তারের ফলে চিনিকল এলাকার ফলন হেক্টর বেশি হয় অথচ চিনিকল বহির্ভূত এলাকায় আধুনিক ইক্ষুজাত ও ইক্ষু উৎপাদন প্রযুক্তিসমূহ বিস্তার না হওয়ায় ইক্ষুর ফলন হেক্টর প্রতি অনেক কম হয়। কাজেই এ ফলন Ñ গ্যাপ পূরণের জন্য চিনিকল বহির্ভূত এলাকায় চাষীর জমিতে বিএসআরআই উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ইক্ষুজাত এবং উৎপাদন কলাকে․শল প্রয়োগ করে প্রদর্শনী স্থাপন করা এবং চাষীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

 

প্রচারেঃ বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী

1 Comment

Leave a Reply

শখের কৃষি
Logo
Reset Password
Shopping cart