একুয়াপনিক সিস্টেমে পানির গুনাগুণ ও করনিয়। একুয়াপনিক পাঠ-৪

একুয়াপনিক সিস্টেমে পানি হচ্ছে মাছের ঘর এবং একই সাথে মাছ, গাছ, ব্যক্টেরিয়া ও অন্য সকল জীবনের সাথে সরাসরি জড়িত। তাই পানির গুনাগুন সম্পর্কে ভালভাবে জানতে হবে। মাছের জন্য সুন্দর একটি পরিবেশ দিতে স্বচ্ছ, পরিষ্কা-পরিশোধিত, অক্সিজেন সমৃদ্ধ, বিষাক্ততা মুক্ত, আনুকূল তাপমাত্রার কোন বিকল্প নেই। পানি খারাপ হলে মাছের কষ্ট হবে, অসুস্ত হয়ে পড়বে, বিভিন্ন রোগ হবে, কানা হয়ে যাবে, খাওয়া বন্দ করে দেবে, এমনকি অল্প সময়ের ভিতর মারাও যাবে। তাই পানিকে ভাল রাখতে আপনাকে করতে হবে কঠোর পরিশ্রম। সবসময় নজর রাখতে হবে। তাই বাঁচতে হলে, জানতে হবে পানির গুনাগুন সম্পর্কে খুব ভালভাবে। এখানে আমরা খুব সাধারনভাবে পানির বিভিন্ন গুনাগুন সম্পর্কে আলোচনা করব।

একুয়াপনিক সিস্টেমে পানি

তাপমাত্রাঃ

আমাদের দেশে পানির তাপমাত্রা বাড়ানোর থেকে কমানো গুরুত্বপূর্ণ। মাছ ছাড়াও পানির অন্য আনেক গুনাগুন যেমন, পিএইস, বিষাক্ত অ্যামোনিয়া, কার্বনডাইঅক্সাইড, দ্রবিভূত অক্সিজেন ইত্যাদি বিষয়ও তাপমাত্রার সাথে জড়িত। এত জটিল হলেও ভয় পাবার কিছু নেই কারন আমরা প্রকৃতি সাথে তাল মিলিয়ে চলব, যুদ্ধ করে নয়। এজন্য আমাদের পরিবেশের তাপমাত্রার সাথে মিল রেখে মাছ চাষ করলে এবিষয়ে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। তাই মাছের জাত বাছাইয়ের দিকে ভালভাবে খেয়াল রাখতে হবে। একই সাথে গাছ, ব্যক্টেরিয়া, কেঁচোর মত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।

পিএইসঃ

পিএইস হচ্ছে পানিতে এসিড ক্ষারের পরিমাণ নির্নয়ক। এক থেকে চোদ্দ পর্যন্ত একটি স্কেল দিয়ে এটি মাপা হয়। সাত হচ্ছে সাধারন পানির পিএইস যা এসিড ও ক্ষারের মাঝামাঝি হওয়ায় মোটামুটি সবার জন্য ভাল। পানির পিএইস ফিস ট্যাঙ্ক ও গ্রো বেড উভয়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাপমাত্রার মত পিএইসও সকল জীবের জীবন ও পানির আনেক গুনাগুন নিয়ন্ত্রণ করে। তাই পিএইস ঠিক রাখা জরুরী। খাবার পানি বা বৃস্টির পানির পিএইস স্বাভাবিকভাবে সাত থাকে। সাতের নিচে গেলে তা এসিড এবং সাতের উপরে গেলে তা ক্ষারের দিকে যায়। পিএইস এর অল্প কমা বা বড়া পানির অনেক পরিবর্তন আনে। এর কারন হচ্ছে পিএইস সাত থেকে আট এ গেলে তা আগের পানির থেকে দশ গুন এবং নয় এ গেলে তা আগের পানির থেকে একশ গুন বেশি ক্ষারীয় হয়। তেমনি সাত থেকে পাঁচে নামলে তা আগের পানির থেকে একশ গুন বেশি এসিডিক হয়। কিভাবে বুঝব এই পরিবর্তন? পিএইস ও তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র এখন আমাদের দেশে একটু খোজ করলেই পেয়ে যাবেন। বিভিন্ন অনলাইন শপ ছাড়াও রাজধানীর টিকাটুলীর হাটখোলা রোডে বিজ্ঞানভিত্তিক আনেক কিছুই পাওয়া যায়। মানুষের জ্বর মাপার মতই সহজ কাজ। সপ্তাহে একবার করে নিয়মিত পিএইস মাপা উচিৎ তবে প্রথম দিকে প্রতিদিন পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। সাধারনভাবে গাছের জন্য পিএইসঃ পাঁচ থেকে সাত, মাছের জন্য পিএইসঃ ছয় দশমিক পাঁচ থেকে আট, ব্যক্টেরিয়া ও কেঁচোর জন্য পিএইসঃ ছয় থেকে আট। তাই সবার জন্য একটি সাধারণ পিএইস ছয় দশমিক আট থেকে সাত যা মাছ, গাছ, ব্যক্টেরিয়া ও কেঁচোর জন্য যেমন ভাল তেমনি পানির বিষাক্ত অ্যামোনিয়া কেও কমিয়ে রাখে। আন্যদিকে নাইট্রোসোমোনাস ব্যক্টেরিয়া যখন মাছের জন্য যা বিষ তাকে পরিবর্তন করে গাছের জন্য খাদ্য তৈরী করে তখন প্রচুর হাইড্রজেন আয়ন তৈরি হয় ফলে পানির পিএইস কমে যায়। তাই আমাদের জানতে হবে কিভাবে পিএইস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে অর্থাৎ বাড়াতে বা কমাতে হবে। সাধারণত একুয়াপনিক সিস্টেমে প্রথমদিকে কিছুদিন পিএইস বেড়ে যায়। তবে কিছুদিন পরথেকে পুষ্টি চক্র শুরু হয়ে গেলে পিএইস কমতে থাকে। তাই পিএইস বাড়ানোর উপায় আমাদের কাছে বেশি গুরুত্ব বহন করে।

কিভাবে পিএইস কমাতে হয়ঃ
কিভাবে পিএইস বাড়াতে হয়ঃ

বাফার দ্রনবঃ

পরের কোন পর্বে আলাদা করে লিখব। আমাদের সাথে থাকুন

অক্সিজেনঃ

পানির অক্সিজেন বলতে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনকে বুঝায়। পানির মত অক্সিজেন জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাছ, গাছ, ব্যক্টেরিয়া ও কেঁচো সবার জন্য অক্সিজেন অত্যাবশকিয় উপাদান। এরা সবাই অক্সিজেন গ্রহণ করে পানির অক্সিজেন কমিয়ে আনে। পানিতে শেওলা হলে তারাও অক্সিজেন গ্রহণ করে। ফলে রাতের বেলা পানিতে অক্সিজেনের অভাব দেখা দিতে পারে। তাপমাত্রা, উচ্চতা ও লবণের পরিমাণ বাড়ার সাথেসাথেও অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। অন্যদিকে পানি যত বেশি নড়াচড়া করবে তত বেশি অক্সিজেন পানিতে মিশবে। এই পানি সকলকে অক্সিজেন পৌছে দেয়। পানিতে তিন থেকে ছয় পিপিএম অক্সিজেন একুয়াপনিক সিস্টেমের জন্য ভাল। দুই পিপিএম অক্সিজেন বা তার কম হলে বেশির ভাগ মাছি মারা যায়। কিভাবে মাপতে পারি এই অক্সিজেনের পরিমাণ? অক্সিজেন মিটার দিয়ে মাপা যায় তবে তা ব্যয়বহুল যন্ত্র। অল্প টাকার যন্ত্র আছে যার বেশীরভাগ ভুল ফলাফল দেয়। তাই আমর মতে যন্ত্র ব্যবহার করতে না পারলে নিয়মিত মাছের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অক্সিজেন কম হলে মাছ শ্বাস নেয়ার জন্য উপরে ভাসতে থাকে। খাবার খেতে চায়না। পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করার জন্য বাজার থেকে ছোট কমপ্রেসার কিনে নেয়া ভাল। একুয়ারিয়ামের দোকানে খোজনিলে পেয়ে যাবেন। ঢাকার কাটাবনে আনেক একুয়ারিয়ামের দোকান আছে। এছাড়া গ্রো বেড এর পানি ফিস ট্যাঙ্কে আসার সময় পাইপ ছিদ্র করে বিশেষ ব্যবস্থা করলে কিছু বাড়তি অক্সিজেন পাওয়া যায়। মূল কথা হচ্ছে পানি যত বেশি নড়াচড়া করবে তত বেশি অক্সিজেন পানিতে মিশবে। আর আনেক মাছের জাত আছে যারা একটু কম অক্সিজেন পানিতেও টিকে থাকতে পারে।

বিশুদ্ধতাঃ

পানির সব গুনাগুন মিলে পানির হয় পানির বিশুদ্ধতা। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত তবে আজকাল বিশুদ্ধ পানি পাওয়া বেশ মুশকিল। বৃষ্টির পানিকে বিশুদ্ধ ধরা যায় তবে অনেক সময় তা সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে যায়। নলকূপের পানি ব্যবহার করা যেতে পারে তবে অনেক নলকূপের পানিতে গ্যাস, কার্বনডাইঅক্সাইড, আর্সেনিকসহ ক্ষতিকর উপাদান বেশি থাকে। আন্যদিকে পৌর এলাকায় সাপ্লাইয়ের পানিতে প্রচুর ক্লোরিন জাতীয় পদার্থ থাকে। তবে এই ক্লোরিন দূর করার জন্য প্রথমে একুয়াপনিক সিস্টেম চালু করে দুই তিন দিন চালালে এবং সাথে সাথে কমপ্রেসার দিয়ে বাতাস দিতে থাকলে ক্লোরিন গ্যাস আকারে চলে যায়। ডিক্লোরিনেটিং ফিল্টার কিনতে পাওয়া যায় যা পাইপ লাইনে সরাসরি ব্যবহার করা যায়। এছাড়া অনেকে ইউভি ফিল্টারও ব্যবহার করেন। তবে সুযোগ থাকলে আলাদা একটা ট্যাঙ্কে পানি ধরে রাখলে কিছুদিনের মধ্যে ক্লোরিন গ্যাস আকারে চলে যায় ফলে এই পানি পরে ব্যবহার করা যায়।

 

একুয়াপনিক  বিষয়ে আরো জানতে আমাদের সাথে সাইটে যোগ দিন। আপনার অভিজ্ঞতা সবার সাথে শেয়ার করুন।

We will be happy to hear your thoughts

Leave a Reply

Logo
Reset Password
Compare items
  • Total (0)
Compare
0