একুয়াপনিক এর খুঁটিনাটি ও বাস্তবতা। একুয়াপনিক পাঠ-২

একুয়াপনিক একটি নতুন প্রযুক্তি। এখনও এর উপর আনেক গবেষণা চলছে ও চলবে। তবে এরই মধ্যে এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার আমাদের দেশে ও বিদেশে শুরু হয়ে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের হাত ধরে একুয়াপনিক একটি সফল প্রযুক্তির নাম। বাংলাদেশে এরই মধ্যে আনেকেই এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে দিয়েছেন। তবে অন্য সবকিছুর মতই কোন কিছু শুরু করার আগে তার সম্পর্কে ভালভাবে জেনে নিতে হয়। আগেই বলেছি একুয়াপনিক শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই তৈরী হয়ে ওঠে একটি জীবন চক্র যা চলতে থাকে অনেকটাই নিজের মত করে। তাই একে এক ধরনের ইকোসিস্টেম বলা যায় আর যেকনো ইকোসিস্টেমের দুটি প্রধান উপাদান থাকে যার একটি হল জৈব উপাদান আরেকটি হল অজৈব বা জড় উপাদান।

একুয়াপনিক এর প্রধান জৈব উপাদান তিনটি।

১। “ফিস ট্যাঙ্ক” এ মাছ

২। “গ্রো বেড” এ গাছ

৩। ব্যক্টেরিয়ার ও কেঁচো

অজৈব বা জড় উপাদানের মাঝে আছে

১। “ফিস ট্যাঙ্ক” ও পানি

২। “গ্রো বেড” ও “গ্রো মিডিয়া”

৩। পাম্প ও পাইপ

৪। সাইফুন সিস্টেম

৫। আবহাওয়া ও পরিবেশ

৬। ভিত্তিস্তর

একুয়াপনিক সিস্টেম

শুরু করার জন্য সবার আগে আমাদের যা দরকার তা হল একুয়াপনিক প্রযুক্তিটি ভালভাবে বুঝে নেয়া তারপর প্রয়োজনিয়  সামগ্রী জোগাড় করা। সবথেকে বড় উপকরণ হচ্ছে “ফিস ট্যাঙ্ক” ও “গ্রো বেড”। “ফিস ট্যাঙ্ক” ও “গ্রো বেড” কি দিয়ে তৈরি করবেন তা ঠিক করার আগে জানা দরকার এদের কি কি গুনাগুন থাকলে তা আপনার একুয়াপনিক সিস্টেমের জন্য ভাল হবে? “ফিস ট্যাঙ্ক” ও “গ্রো বেড” এর জন্য একই জাতিয় দ্রব্য ব্যবহার করা যায় আবার আলাদা আলাদা দ্রব্যও ব্যবহার করা যায়। “ফিস ট্যাঙ্ক” ও “গ্রো বেড” একটি অপরটির সাথে যুক্ত থাকে পানির পুনঃপুন ব্যবহারের জন্য। তাই দুটি উপাদানের কিছু সাধারন মিল আছে। যেমনঃ

জলরোধী ও মজবুতঃ  “ফিস ট্যাঙ্ক” ও “গ্রো বেড” অবশ্যই জলরোধী ও মজবুত হতে হবে। তবে যেহেতু “ফিস ট্যাঙ্ক” ও “গ্রো বেড” একটি অপরটির সাথে যুক্ত থাকে তাই এদের যুক্ত করার জন্য ছিদ্র করা ও পাইপ লাগানোর উপযগী হতে হবে।  “ফিস ট্যাঙ্ক” এ প্রচুর পানি ও মাছ থাকে যার ওজন নেয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। আন্যদিকে “গ্রো বেড” এ পাথরের মত ভারী “গ্রো মিডিয়া”, পানি ও গাছ থাকবে যাদের একত্রিত ওজন অনেক বেশি। ষোল স্কয়ার ফিট একটি গ্রো বেডকে ছয়শ কেজি বা তার বেশিও ওজন নিতে হতে পারে। যা মূলত গ্রো মিডিয়ার উপর নির্ভর করে। এসব বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।

 

খাদ্য নিরাপত্তাঃ “ফিস ট্যাঙ্ক” ও “গ্রো বেড” উভয় মাধ্যমেই আপনার খাদ্য মাছ ও সবজি উৎপাদন হবে তাই এ ক্ষেত্রে ব্যবহারিত কোন দ্রব্যে কোন প্রকার বিসাক্ততা থাকতে পারবে না।

দ্রবনতা ও পিএইসঃ পানিতে দ্রবভূত হয় এবং পানির গুনাগুন পরিবর্তন করে এমন কোন দ্রব্য ব্যবহার করা যাবে না। বিশেষ করে পানির তাপমাত্রা ও পিএইস খুবই গুরুত্বপূর্ন।

 

“ফিস ট্যাঙ্ক” এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যঃ ফিস ট্যাঙ্ক মাছের জন্য অণুকুল পরিবেশ তৈরী করতে হবে। ছোট আকারে একুয়ারিয়ামে করতে চাইলে আপনার নিজের একুয়ারিয়ামটাই ভাল হবে তবে একটু বড় করে খাবার জন্য তেলাপিয়া জাতীয় মাছের জন্য কমপক্ষে দুইশ লিটার এর ট্যাঙ্ক ভাল হয়। ট্যাঙ্কের গভীরতা একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। এটি কমপক্ষে আটারো ইঞ্ছি বা ছিচল্লিশ সেন্টিমিটার হলে ভাল হয়। তবে আকার আপনার সামগ্রিক পরিকল্পনার উপর নির্ভর করবে। এক হাজার লিটার হলে একটি আদর্শ মাপের হয়। মনে রাখতে হবে ট্যাঙ্কের আকার যত বড় হবে সমস্যা বা ভুল তত কম হবে।

যেকোন আকারের ট্যাঙ্ক ব্যবহার করা যায়। তবে ট্যাঙ্কের ট্যাঙ্কের নিচটা কোনিক্যাল আকৃতির হলে মাছের সকল বর্জ্য এক জায়গায় জমা হতে পারে যা অপসারণ করা সহজ। ফিস ট্যাঙ্ক এর জন্য আলোর কোন প্রয়োজন নেই তাই এটিকে ছায়ায় বা ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

 

“গ্রো বেড” এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যঃ গ্রো বেড মূলত গাছের জন্য, এতে থাকবে মাটির বিকল্প কিছু যা গ্রো মিডিয়া  বা মিডিয়া নামে পরিচিত। আরো থাকবে ফিস ট্যাঙ্ক থেকে আসা পানি ও গাছ। এসবের একত্রিত ওজন আনেক বেশি। আমাদের যার প্রতি বেশি নজর দিতে হবে তা হল গাছের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা। গাছের বেড়ে ওঠার জন্য গাছের শিকড়কে আগে বেড়ে উঠতে দিতে হবে। গাছের শিকড়ের দিকে লক্ষ্য দিলে দেখা যায়  গ্রো বেডের গভীরতাকে আমরা তিনটি  স্থরে ভাগ করতে পারি।

প্রথমত পৃষ্ঠতল বা শুকনা স্তরঃ উপর থেকে প্রায় দুই ইঞ্ছি বা পাঁচ সেন্টিমিটার স্তরকে আমরা পৃষ্ঠতল বা শুকনা স্তর বলতে পারি। এ স্তরে পানি জমে থাকবে না বরং তা একটু শুকনা থাকবে। এর ফলে আমরা বেশ কিছু সুবিধা পাই। যেমন, পানির উপর একটি স্তর থাকায় নিচের পানি বাতাসে উড়ে যেতে বাঁধা পায় ফলে পানির ব্যবহার কমে আসে। শুকনা থাকার কারনে গাছের গোড়ায় অক্সিজেন ও আলো বাতাস পায়। শৈবাল জাতিয় বড়তি উদ্ভিৎ জম্নাতে পারে না। আরো বড় সুবিধা হচ্ছে পাউডারি মিল্ডুর মত পানি সম্পর্কিত রোগ জীবানু থেকে বাঁচা যায়। যেসব গাছ গোড়ায় পানি সহ্য করতে পারেনা তারাও জম্নাতে পারে যেমন, পেঁপে ও মরিচ গাছ।

দ্বিতীয়ত শিকড় স্তর বা রুট জোনঃ  উপরের পাঁচ সেন্টিমিটার পর থেকে পরের বিশ সেন্টিমিটার বা সাত আট ইঞ্ছি পর্যন্ত এই এলাকা। এ এলাকায় থাকে পানি, উপকারি ব্যক্টেরিয়া, বিভিন্ন অণুজীব ও কেঁচো সহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। গাছের বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন স্তর এটি।

 

তৃতীয়ত তলানি স্তরঃ শিকড় স্তর এর পর থেকে আরো দুই ইঞ্ছি বা পাঁচ সেন্টিমিটার পর্যন্ত এই স্তর। এই স্তরে মাছের বর্জ্য ও অন্যান্য অদ্রবণীয় পদার্থ জমে থাকে।

 

এরপরের বিষয়টি হল গ্রো বেড এর প্রস্থতা কি হবে? সেহেতু নিয়মিত আপনাকে গাছের পরিচর্যা করতে হবে তাই এর প্রস্থতা আপনার হাতের ভিতরেই থাকা উচিৎ। খেয়াল রাখতে হবে আপনি কি গ্রো বেড এর দুই পাশ থেকে গাছের যত্ন নিতে পারবেন নাকি একপাশ থেকে? সাধারানত আমরা ত্রিশ ইঞ্ছি বা পচাত্তর সেন্টিমিটার প্রস্থতায় একপাশ থেকে কাজ করি আর দুপাশ থেকে কাজ করতে পারলে এই দূরত্ব আটচল্লিশ ইঞ্ছি বা একশত বিশ সেন্টিমিটার পর্যন্ত সহজে বাড়ান যায়।

 

এছাড়াও গ্রো বেডের বিভিন্ন মডেল আছে। ফিল্টার ব্যবহার করে হাইড্রপনিকের মত আনেক মডেলে একুয়াপনিক গ্রো বেড তৈরী করা যায়।

 

একুয়াপনিক  বিষয়ে আরো জানতে আমাদের সাথে সাইটে যোগ দিন। আপনার অভিজ্ঞতা সবার সাথে শেয়ার করুন।

We will be happy to hear your thoughts

Leave a Reply

Logo
Reset Password
Compare items
  • Total (0)
Compare
0