ইক্ষু বা আঁখের সাথীফসল, জোড়া সারি পদ্ধতি

ইক্ষুর সাথে সাথীফসল চাষের উপকারিতা, লাভজনক সাথীফসল নির্বাচন ও চাষ পদ্ধতি। জোড়া সারি পদ্ধতিতে ইক্ষু ও একাধিক সাথীফসলের চাষ।

ইক্ষু একটি দীর্ঘমেয়াদী ফসল। রোপণ থেকে কর্তন পর্যন্ত ১২-১৪ মাস সময় লাগে। রোপণের পর প্রাথমিক পর্যায়ে ৪-৫ মাস পর্যন্ত সময় এই ফসলের বৃদ্ধি ধীর গতি সম্পন্ন। এ সময়ে দু’সারি আখের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গায় এক বা একাধিক স্বল্প মেয়াদী ফসল সাথীফসল হিসাবে চাষ করা যায়। এর মাধ্যমে কৃষক তার অন্যান্য ফসলের চাহিদা মিটিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হয় ।

আঁখের সাথীফসল

আঁখের সাথীফসল

 ইক্ষু বা আঁখের সাথীফসল উৎপাদনের উপকারিতা

১. সাথীফসল চাষের মাধ্যমে একটি অতিরিক্ত ফসল পাওয়া যায়।
২. বাড়তি আয় হয়।
৩. খাদ্য ও পুষ্টি সমস্যা সমাধানে সহায়ক হয়।
৪. সাথীফসলে আন্তঃপরিচর্যা করার ফলে মূল ফসলের আংশিক আন্তঃপরিচর্যাও হয়ে যায়।
৫. কিছু কিছু সাথীফসল মূল ফসলের ফলন বাড়াতে সহায়তা করে-যেমন আলু, পিঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি।
৬. অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
৭. প্রাকৃতিক দূর্যোগে মূল ফসল বিপর্যয় বা ক্ষতিগ্র¯ত হওয়ার সম্ভাবনার বিরুদ্ধে আংশিক নিরাপত্তা হিসাবে কাজ করে।
৮. উভয় ফসলই স্বল্প খরচে উৎপাদন সম্ভব।
৯. চাষীর রবি ফসলের অভাব দূর করে।
১০. আখ দীর্ঘ মেয়াদী ফসল হওয়ায় চাষী স্বল্পকালীন ফষল চাষের মাধ্যমে অন্তবর্তী কালীন আর্থিক সহায়তা লাভ করে।
১১. জমির সর্বোত্তম ব্যবহার ও জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়।

 ইক্ষু বা আঁখের  লাভজনক সাথীফসল নির্বাচন

১. আখ ও সাথীফসলের রোপণ/বপনের সময়কাল সুসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
২. সাথীফসলের জীবনকাল স্বল্পমেয়াদী হতে হবে।
৩. কম শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট হতে হবে যাতে আখের ফলনের উপর কোন ক্ষতিকারক প্রভাব না ফেলে।
৪. মূল ফসলের সাথে খাদ্য গ্রহনের প্রতিযোগিতা কম হতে হবে।
৫. সাথীফসল এমন হতে হবে যেন আখে কোন রোগ বা পোকা আক্রমণ বৃদ্ধি না পায়।

৬. চাহিদা ও বাজার মূল্য আছে এমন সাথীফসল নির্বাচন করতে হবে।

লাভজনকভাবে চাষ করা যায় এমন সাথীফসল সমূহ নিম্নরূপ ঃ
১. প্রথম সাথীফসল ঃ আলু, পিঁয়াজ, রসুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলী, গাজর, পালংশাক, মূলা, বুশবিন, মসুর, ছোলা, মটরশুটি, খেসারি, মাসকালাই, সরিষা, কালজিরা, ধনিয়া ইত্যাদি
২. দ্বিতীয় সাথীফসল ঃ মুগডাল, তিল, লালশাক, ডাটাশাক, ক্সধঞ্চা, সনপাট ইত্যাদি

 ইক্ষু বা আঁখের  জোড়াসারিতে ইক্ষু ও একাধিক সাথীফসল চাষ

সাধারণতঃ ৯০-১০০ সেঃমিঃ (৩-৩.২৫ ফুট) দূরত্বে সারি করে নালায় আখ লাগান হয় এবং দু’সারি আখের মধ্যবর্তী আপাতঃ ফাঁকা
স্থানে সাথীফসল আবাদ করা হয়। এ অবস্থায় সাথীফসল ও আখ খাদ্য ও পানির জন্য পরস্পর প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়।
জোড়াসারি পদ্ধতিতে আখ ও সাথীফসলের মধ্যকার প্রতিযোগিতা কম হয় এবং আখের উপরে কোন বিরূপ প্রভাব ছাড়াই অধিক পরিমাণ সাথীফসল উৎপাদনে সহায়তা করে। এ পদ্ধতিতে জমি চাষের পরে ১২০-১৪০ সেঃমিঃ দূরে দূরে ৩০-৬০ সেঃমিঃ প্রশস্ত নালায় দু’সারি চারা রোপণ করা হয়। উপরন্ত প্রথম সাথীফসল তোলার পর আরও একটি স্বল্প মেয়াদী ফসল ২য় সাথীফসল হিসাবে উৎপাদন করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ৩য় সাথীফসলও উৎপাদন করা সম্ভব হয়।

 ইক্ষু বা আঁখের জোড়াসারি আখের সাথে সাথীফসল উৎপাদনের সুবিধাসমূহ

১. আখের ক্ষতি না করেই একাধিক সাথীফসল উৎপাদন সম্ভব।
২. অধিক সংখ্যক সারি রোপণের মাধ্যমে সাথীফসলের ফলন প্রচলিত একসারি পদ্ধতির তুলনায় বৃদ্ধি করা সম্ভব।
৩. দুই জোড়াসারি আখের মধ্যবর্তী স্থান যথেষ্ট প্রশস্ত হওয়ায় জমির সর্বাধিক ও সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে একই জমি থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে একাধিক ফসল উৎপাদন সম্ভব।
৪. ছোট ও প্রান্তিক চাষীদের জন্য একাধিক সাথীফসল উৎপাদনসহ ভূমিহীন কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
৫. জোড়াসারি আখের সাথে সরিষা, গম, ছোলার মত জনপ্রিয় ফসলসমূহও সাথীফসল হিসাবে চাষ করা ও ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব।
৬. আখ ও পর পর দু’টি সাথীফসলের চাষ করলে একক ফসলের তুলনায় আয় অনেক বেশী হয়।

ইক্ষু বা আঁখের জোড়াসারিতে ইক্ষু ও সাথীফসল রোপণ/বপন পদ্ধতি

উপযুক্ত চাষ ও মই দিয়ে জমি প্রস্তুত করার পর ৩০-৬০ সেঃমিঃ (১.০-২.০ ফুট) দূরত্বে হাত লাঙ্গল দ্বারা লাইন টেনে কোদাল দ্বারা ১৫-২০ সেঃমিঃ (৬-৯ ইঞ্চি) গভীর নালা করে নিতে হবে, নালার মাটি ৩০-৬০ সেঃমিঃ দূরত্বের দুই নালার মধ্যবর্তী স্থানে রাখতে হবে। এর পর ১২০-১৪০ সেঃমিঃ ফাঁকা রেখে আবার দু’টি জোড়া সারির নালা করতে হবে। এভাবে সমস্ত জমির নালা কেটে প্রচলিত পদ্ধতিতে নালায় মাথায়-মাথায় বীজ খন্ড স্থাপন করে অথবা আধুনিক পদ্ধতিতে ৩০-৫০ সেঃমিঃ দূরত্বে চারা রোপণ করা যেতে পারে। এভাবে ঘন করে দু’টি আখ সারি রোপণ করে বিস্তৃত ফাঁকা জায়গা রেখে আবার ঘন করে দু’টি আখ সারি রোপণ করতে হবে। এ পদ্ধতিতে জমিতে মোট আখের সারির সংখ্যা প্রচলিত পদ্ধতির সমানই থাকে শুধুমাত্র আখের সারির ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করে সাথীফসলের জমির পরিমাণ বাড়ানো যায়। আখ ও সাথীফসলের জন্য পৃথক পৃথক ভাবে আন্তপরিচর্যা ও অনুমোদিত মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে।

একসারি এবং জোড়াসারি পদ্ধতিতে চাষকৃত আখ ও সাথীফসলের সুপারিশকৃত সারের মাত্রা (কেজি/হেক্টর)

সাথীফসলের নাম, উৎপাদন লক্ষ্য মাত্রা (টন/হে্‌ ইউরিয়া, টিএসপ্‌ এমপি, জিপসাম,  জিঙ্ক সালফেট বোরাক্স
আখ ১০০ ৩২৫ ২৫০ ১৮০ ১৯০ ৯ –
সাথীফসল (একসারী পদ্ধতি)
আলু ১০ ১২০ ৬০ ১০০ ৪৫ – –
পিঁয়াজ/রসুন ৬/৩ ৯০ ৭৫ ১১০ ৫০ ৬ –
সরিষা ০.৫ ৭৫ ৬০ ৪০ ৬০ ৩ ৩
ছোলা ০.৬ ২০ ৫০ ২০ ৫০ ৮ ২
মশুর ০.৫ ২০ ৫০ ২০ ৫০ ৭ ৩

সাথীফসল (জোড়াসারি পদ্ধতি)
আলু ১৫ ১৫০ ৭৫ ১২০ ৫৫ – –
পিঁয়াজ/রসুন ৮/৫ ১১০ ৯০ ১৩০ ৬০ ৮ –
সরিষা ০.৭ ৯০ ৭৫ ৫০ ৭৫ ৪ ৪
ছোলা ০.৭৫ ৩০ ৬০ ৩০ ৬০ ১০ ৩
মশুর ০.৮ ২৫ ৬০ ২৫ ৬০ ১০ ৪
বাঁধাকপি ৪০ ২২৫ ৯০ ১২০ ৬০ ৬ ৩
ফুলকপি ১০ ২০০ ৯০ ১২০ ৬০ ৬ ৩
পালং শাক ৮ ৬০ ২৫ ৬৫ ৪০ – –
গীষ্ম. মুগডাল ০.৬ ২০ ৪০ ২৫ – – –
গীমা কলমী ১০ ৬০ ২৫ ৬০ ১০ – –
লাল শাক ৬ ৫০ ২৫ ৫০ ১০ – –

We will be happy to hear your thoughts

Leave a Reply

শখের কৃষি
Logo
Reset Password
Shopping cart