ইক্ষুর ক্ষতিকারক প্রধান পোকা-মাকড়সমূহ, আক্রমনের লক্ষণ ও দমন ব্যবস্থাপনা

পোকামাকড়ের কারণে আখের ফলনে ২০% এবং চিনি আহরণে ১৫% ক্ষতি হয়ে থাকে। ফলে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করে উল্লেথিত পরিমান ক্ষতি কমিয়ে আখ চাষকে অধিক লাভজনক করা সম্ভব । আখের মোট সনাক্তকৃত পোকামাকড়ের সংখ্যা ৭০ টি, সনাক্তকৃত উপকারী পোকামাকড়ের সংখ্যা (প্রায়) ৫০ টি এবং অধিক ক্ষতিকর পোকার/প্রজাতির সংখ্যা ১২ টি।

আখের বিভিন্ন পোকামাকড় ঃ ডগার মাজরা, আগাম মাজরা, গোড়ার মাজরা, কান্ডের মাজরা, হোয়াইটগ্রাবস্, উঁইপোকা, পাইরিলা, আঁশ পোকা, সাদামাছি, ছাতরাপোকা ইত্যাদি

ডগার মাজরা পোকা ঃ
(ক) আক্রমনের লক্ষণ ঃ
১. পাতার মধ্য শিরার পার্শ্ব বরাবর সুতার মত লম্বালম্বি দাগ দেখা যায়। পাতায় প্রায় সমান্তরালভাবে ছোট ছোট ছিদ্র চোখে পড়ে এবং এক পাশ পুড়ে কুকড়ে যায়।
২. আখের মাইজ মরা দেখা যায় যা কুকড়ানো এবং পোড়া পোড়া ভাব থাকে।
৩. বয়¯‥ গাছে আক্রমন হলে অনেক সময় পার্শ্ব শাখা গজায়।

(খ) দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১. পোকামুক্ত বীজ রোপণ করা।
২. আগাম চাষ (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) ও কর্তন (অক্টোবর-জানুয়ারী) অনুসরণ করা।
৩. নিয়মিত আগাছা দমন করা।
৪. অনুমোদিত মাত্রায় সার প্রয়োগ করা।

৫. মথ সংগ্রহ করে মেরে ফেলা (জানুয়ারী-জুন)।
৬. ডিমের গাদা সংগ্রহ করে ধ্বংস করা (জানুয়ারী-জুন)।
৭. আক্রান্ত গাছ পোকাসহ কেটে ধ্বংস করা (জানুয়ারী-জুন)।

রাসায়নিক দমন ব্যবস্থা 

কীটনাশকের নাম পয়োগমাত্রা পয়োগ পদ্ধতি
ফুরাডান ৫জি/কুরাটার ৫জি/ ফুরাটাফ ৫জি/ফরাফুরান
৫জি/
সানফুরান ৫জি/ব্রিফার ৫জি/ ফেন্ডোর ৫জি/ফুরাসান
৫জি/কুড়িডান ৫জি/আলফাফুরান ৫জি/রাজফুরান ৫জি/বিষ্টারেন ৫জি/কেমিফুরান ৫জি/করোফুরান ৫জি/প্যারাডক্স ৫জি/হে-ফুরান ৫জি ৪০.০ কেজি/হেঃ আখের সারির দু’পাশে নালা কেটে নালা ও দু’নালার
মধ্যবর্তী স্থানে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। অতঃপর মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। মাটিতে রস না থাকলে
সেচ দিতে হবে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ২ বার (২য় ও ৩য় প্রজন্মে) প্রয়োগ করতে হবে।

আগাম মাজরা পোকা ঃ
(ক) আক্রমনের লক্ষণ ঃ
১. আখের মাইজ মরে যায়। মরা মাইজ টানলে সহাজেই উঠে আসে এবং দূর্গন্ধ ছড়ায়।
২. গাছের গোড়ায় কীড়া ঢোকার ছিদ্র চিহ্ন এবং বিষ্ঠা প্রভৃতি দেখা যায়।

(খ) দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১. সহনশীল জাত চাষ করা।
২. আগাম চাষ অনুসরণ করা (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর)।
৩. আক্রান্ত গাছ মাটির নীচ থেকে (পোকাসহ) তুলে ধ্বংস করা (ডিসেম্বর-এপ্রিল)।
৪. জমি আগাছা মুক্ত রাখা।
৫. গাছের গোড়ায় হালকাভাবে মাটি দেয়া (২/৩ বার)।
৬. গমের জমির পাশে বা গমের সঙ্গে (সাথী ফসল) চাষ পরিহার করা।

রাসায়নিক দমন ব্যবস্থা 

কীটনাশকের নাম পয়োগমাত্রা পয়োগ পদ্ধতি
ফুরাডান ৫জি/কুরাটার ৫জি/ ফুরাটাফ ৫জি/ফুরাসান ৫জি/ এগ্রিফুরান ৫জি/ফেনডোর ৫জি/ ব্রিফার ৫জি
/ফরাফুরান ৫জি/ পিলারফুরান ৫জি/আলফাফুরান ৫জি/কেমিফুরান ৫জি/কুড়িডান ৫জি/হে-ফুরান ৫জি ৪০.০ কেজি/হেঃ রোপনের সময় নালায় অথবা পোকার ২য় পজন্মে
(সাধারণতঃ ফেব্রুয়ারী) আখের সারির দু’পাশে ৩ ইঞ্চি (৮ সেমি.) গভীর নালা করে নালায় ও গাছের গোড়ায় ছিটিয়ে প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। মাটি
ভেজা না থাকলে সেচ দিতে হবে।
অথবা
মার্শাল ৬জি/রিজেন্ট ৩জিআর অথবা লরসবান ১৫জি/
সাইরেন ১৫জি/পাইরিবান ১৫জি
৩৩.০ কেজি/হেঃ
১৫.০ কেজি/হেঃ


অথবা রিজেন্ট ৫০ এসসি ২ .০ লিঃ/হেঃ সেট রোপনের সময় পানিতে মিশিয়ে সিঞ্চন যš বা
ঝাঁঝরির সাহায্যে ট্রেঞ্চে প্রয়োগ করতে হবে।

গোড়ার মাজরা পোকা ঃ
(ক) আক্রমনের লক্ষণ ঃ
১. প্রাথমিকভাবে গাছের ৩য়-৪র্থ পাতা উপর দিক থেকে শুকাতে থাকে।
২. মাইজ পাতা মরে যায়। মরা মাইজ টানলে সহজে উঠে আসে না।
৩. পরবর্তীকালে আক্রান্ত গাছের সব পাতগুলো ক্রমশঃ হলুদ হয়ে শুকিয়ে যায়।

(খ) দমন ব্যবস্থাপনা ঃ

১. গভীর চাষ অনুসরণ করা।
২. আক্রান্ত গাছ মাটির নীচ থেকে পোকাসহ তুলে ধ্বংস করা (জানুয়ারী-জুন)।
৩. সম্ভাব্য ক্ষেত্রে সেচ দিয়ে পানি কয়েকদিন ধরে রাখা (ফেব্রুয়ারী-মে)।
৪. অধিক আক্রান্ত এলাকায় মুড়ি আখ চাষ স্থগিত রাখা।
৫. ফসল চক্র অনুসরণ করা।
৬. পুরনো শুকনো পাতাগুলো গাছ থেকে ছড়িয়ে ফেলা (আগষ্ট-অক্টোবর)।
৭. আগাম কর্তন অনুসরণ করা (অক্টোবর-জানুয়ারী)।
৮. কর্তনের পর মোথাগুলো চাষ দিয়ে বা কোদাল দিয়ে তুলে পুড়িয়ে ধ্বংস করা।

রাসায়নিক দমন ব্যবস্থা 

কীটনাশকের নাম পয়োগমাত্রা পয়োগ পদ্ধতি
লরসবান ১৫জি ১৫ কেজি/হেঃ জমির জোঁ অব¯ায় গাছের গোড়ার কাছে ছিটিয়ে পয়োগ করার পর মালচিং কোদাল
দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। জোঁ অবস্থা না থাকলে ১/২ দিন পূর্বে সেচ দিয়ে নিতে হবে।

কান্ডের মাজরা পোকা ঃ
(ক) আক্রমনের লক্ষণ ঃ

১. প্রাথমিক অবস্থায় গাছের পাতাগুলো শুকাতে থাকে এবং পরিণতিতে আখের মাথা বা উপরিভাগ মরে যায়। কখনো কখনো আক্রান্ত গাছের মাথা সহজেই ভেঙ্গে যায়।
২. দ্বিতীয় পর্যায়ের আক্রমনে কান্ডের গায়ে অসংখ্য ছিদ্র থাকে এবং ছিদ্রের গায়ে গুড়ার মত ময়লা এবং কীড়ার মল দেখা
যায়।
৩. আক্রান্ত গাছে কখনও কখনও শিকড় গজায় এবং আখের কান্ড জড়িয়ে ফেলে এবং অনেক ক্ষেত্রে চোখ গজিয়ে গাছ বের
হয়।

(খ) দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১. পোকা প্রতিরোধী/সহনশীল জাতের চাষ করা।
২. প্রত্যায়িত বীজ ক্ষেতের আখ ব্যবহার করা।
৩. পোকা মুক্ত বীজখন্ড রোপন করা।
৪. প্রাথমিক আক্রান্ত গাছ পোকাসহ কেটে ধ্বংস করা (মে-জুলাই)।
৫. পুরনো শুকনো পাতাগুলো গাছ থেকে ছড়িয়ে ফেলা (আগষ্ট-অক্টোবর)।
৬. আগাম কর্তন অনুসরণ করা (অক্টোবর-জানুয়ারী)।

রাসায়নিক দমন পদ্ধতি 

কীটনাশকের নাম পয়োগমাত্রা পয়োগ পদ্ধতি
পাদান ৪জি/সিডান ৪জি/রাজেক্স
৪জি/ফরওয়াটাপ ৪জি/সানডান ৪জি ৭৫.০ কেজি/হেঃ আখের সারির উভয় পাশে অগভীর নালা কেটে নালায় ছিটিয়ে
প্রয়োগ কারার পর মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। জুন-আগষ্ট মাসের মধ্যে পোকার আক্রমন অনুযায়ী ২-৩ বার প্রয়োগ করতে হবে।

হোয়াইটগ্রাবস্ ঃ
আক্রমনের লক্ষণ ঃ
১. কীড়াগুলো আখের শিকড় খায় ফলে গাছ দুর্বল ও রোগা হয়।
২. পুষ্টিহীনতার জন্য গাছের পাতা ক্রমশঃ হলুদ হয়ে যায়।
৩. ক্ষেতে গাছের বৃদ্ধি সমানভাবে হয় না বলে গাছগুলো বিভিন্ন উচ্চতাবিশিষ্ট হয়।
৪. হোয়াইটগ্রাবস্ আক্রান্ত গাছ সামান্য জোরে টান দিতেই উঠে আসে এবং কীড়াগুলো নজরে পড়ে।

(খ) দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১. আম, জাম, পেয়ারা, কাঁঠাল প্রভৃতি গাছ থেকে এদের পূর্ণাঙ্গ বিটলগুলো হাতজালের/আলোর ফাঁদের সাহায্যে সংগ্রহ করে
মেরে পুঁতে ফেলা (ফেব্রুয়ারী-এপ্রিল)।
২. রোপনের পূর্বে বার বার গভীর চাষ দিয়ে জমি ২/৩ দিন ফেলে রাখা। গভীর ট্রেঞ্চ করা।
৩. আগাম চাষ অনুসরণ করা (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর)।
৪. সেচ দিয়ে/বৃষ্টির পানি জমিয়ে আক্রান্ত ক্ষেত ৫/৭ দিন ডুবিয়ে রাখা।
৫. ফসল চক্র অনুসরণ করা।
৬. অধিক আক্রান্ত ক্ষেতে মুড়ি আখ চাষ স্থগিত রাখা।

রাসায়নিক দমন ব্যবস্থা 

কীটনাশকের নাম পয়োগমাত্রা পয়োগ পদ্ধতি
ফুরাডান ৫জি/কুরাটার ৫জি/ ফুরাটাফ ৫জি/ফেন্ডোর
৫জি/ ফুরাসান ৫জি/সানফুরান ৫জি/ ভিটাফুরান ৫জি/এগ্রিফুরান ৫জি/ রাজফুরান ৫জি/ ব্রিফার ৫জি/ আরোধান ৫জি/ লিমিকার্ব ৫জি/ কেমফুরান ৫জি/ পিলারফুরান ৫জি/ফরাফুরান ৫জি ৪০.০ কেজি/হেঃ আখের সারির উভয় পাশে নালা কেটে ও গাছের
গোড়ায় দানগুলো ছিটিয়ে দেওয়ার পর মাটি দিয়ে
ঢেকে দিতে হবে। দুই বার প্রয়োগ করতে হবে। ১ম বার মার্চ মাসের মাঝামাঝি এবং ২য় বার এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি।

উঁইপোকা ঃ
(ক) আক্রমনের লক্ষণ ঃ

১. রোপনকৃত বীজখন্ড খেয়ে ফেলার দরুন গাছ গজাতে পারে না, ফলে মাঠে গাছের সংখ্যা অনেক কমে যায় যাকে গ্যাপী জারমিনেশন বলা হয়।
২. আখ দাঁড়ানো অবস্থায়ও এরা আখের মূল শিকড় ও কান্ড খেয়ে ক্ষতি সাধন করে। দাঁড়ানো আখে মাঝে মধ্যে উঁই পোকার টানেল দেখা যায়।
৩. আক্রান্ত কচি গাছ শুকিয়ে মারা যায়।

(খ) দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১. উঁই পোকার ঢিবিসহ ধ্বংস করা এবং রাণী উঁই সংগ্রহ করে মেরে ফেলা।
২. সেট রোপনের জন্য গভীর চাষ/গভীর নালা করা।
৩. আঁকাবাঁকা পদ্ধতিতে সেট রোপন করা।
৪. এসটিপি পদ্ধতি অনুসরণ করা/উৎসাহিত করা।
৫. খাদ্য ফাঁদ ব্যবহার করা (মাটির হাড়িতে পাট কাঠি, ক্সধঞ্চা রেখে জমিতে পুতে রেখে পরে তুলে উঁই পোকাগুলো মেরে
ফেলা)।
৬. সেচ দিয়ে কয়েকদিন জমিতে পানি ধরে রাখা (সম্ভাব্য ক্ষেত্রে)।
৭. মুড়ি আখ চাষ স্থগিত করা।
৮. ফসল চক্র অনুসরণ করা।

রাসায়নিক দমন ব্যবস্থা 

কীটনাশকের নাম পয়োগমাত্রা পয়োগ পদ্ধতি
রিজেন্ট ৩জিআর ৩৩ .০ কেজি/হেঃ নালায় সেট বসানোর পর ছিটিয়ে পয়োগ করা এবং যথাশীঘ সেট ও
কীটনাশক মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া। মাটিতে জোঁ থাকা বাঞ্চনীয়।

পাইরিলা হপার ঃ
(ক) আক্রমনের লক্ষণ ঃ
১. পূর্ণাঙ্গ ও অপূর্ণাঙ্গ উভয়ই পাতার নীচে দলবদ্ধভাবে থেকে পাতার রস চুষে খায়। ফলে গাছের পাতা ক্রমশঃ হলদে থেকে বাদামী হয়ে যায় এবং পাতায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিহ্ন দেখা যায়।
২. রস চোষার সময় এদের গা থেকে এক রকম মিষ্টি লালা বের হয় যা বাতাসের আদ্রতায় মিশে পাতার উপরে কালো ছত্রাক
রোগের সৃষ্টি করে।

(খ) দমন ব্যবস্থাপনা ঃ

১. নরম ও চওড়া পাতাবিশিষ্ট জাত পরিহার করা।
২. ডিমের গাদা পাতাসহ কেটে/ হাতে কাপড় পেচিয়ে পিষে ধ্বংস করা (ফেব্রুয়ারী-জুন)।
৩. হাত জাল ও টানা জালের সাহায্যে নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ পোকা সংগ্রহ ও ধ্বংস করা (ফেব্রুয়ারী-জুন)।
৪. পরজীবি পোকা মাঠে সংরক্ষণ ও বিস্তার করা।
৫. শুকনো মরা পাতা ছাড়ানো ও পুড়ানো (আগষ্ট-অক্টোবর)।
৬. আগাম কর্তন অনুসরণ করা (অক্টোবর-জানুয়ারী)।
৭. কর্তনের পর আক্রান্ত শুকনো পাতা, মোথা ইত্যাদি জড়ো করে পুড়িয়ে ফেলা।
৮. মোথা থেকে গজানো আখ কেটে ফেলা।

We will be happy to hear your thoughts

      Leave a Reply

      Logo
      Reset Password
      Compare items
      • Total (0)
      Compare
      0