আধুনিক পদ্ধতিতে ইক্ষু বা আঁখ চাষের জন্য করনীয়

আধুনিক পদ্ধতিতে ইক্ষু বা আঁখ চাষের জন্য করনীয়

আধুনিক পদ্ধতিতে ইক্ষু বা আঁখ চাষের জন্য করনীয়

ইক্ষু চাষের জমি নির্বাচন

উচু ও মাঝারী উঁচু জমি যেখানে বন্যা বা বৃষ্টির পানি জমে না সে সব জমি ইক্ষু চাষের জন্য উপযোগী। তবে বালি মাটি ছাড়া যে কোন ধরনের মাটিতেই সফল ভাবে ইক্ষু চাষ করা যায়। দো-আশ, বেলে দো-আশ এবং এটেল দো-আশ মাটি ইক্ষু চাষের জন্য ভাল। জমিটি অবশ্যই সমান হতে হবে এবং একদিকে সামান্য ঢালু হলে ভাল হয়।

ইক্ষু জমি তৈরী

ইক্ষু লম্বা কান্ড ও প্রচুর শিকড় বিশিষ্ট একটি দীর্ঘ মেয়াদী ফসল। রোপণ থেকে কর্তন পর্যন্ত প্রায় ১২ থেকে ১৪ মাস সমায় লাগে। ইক্ষুর শিকড় মাটির বেশ গভীরে (১ থেকে ৪ মি: পর্যন্ত) প্রবেশ করে। শিকড়গুচ্ছ যাতে অবাধে বিস্তার লাভ করে মাটি হতে সহজে প্রচুর রস ও খাদ্য উপাদান গ্রহণ করতে পারে সে জন্য আখের জমি ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি গভীর করে আড়াআড়ি ভাবে ৪-৫ টি চাষ ও মই দিয়ে জমি উত্তম রূপে ক্সতরী করতে হবে। জমি ‣তরীর পর ১ মিটার দূরে দূরে ৬-৯ ইঞ্চি গভীর নালা করে নালায় বীজ খন্ড বা চারা রোপণ করতে হবে।

ইক্ষু বীজ নির্বাচন

প্রত্যায়িত ইক্ষু বীজ ক্ষেত থেকে অনুমোদিত জাত বীজ হিসাবে নির্বাচন করতে হবে। সাধারণতঃ ৮-৯ মাস বয়সের অপরিপক্ক বীজ ইক্ষু চাষের জন্য ভাল। এ বয়সে ইক্ষুর চোখগুলো সতেজ থাকে এবং ইক্ষুর কান্ডে নাইট্রোজেন ও গ্লুকোজের পরিমান বেশী ও চিনির পরিমান কম াকায় চোখগুলো তাড়াতাড়ি গজায়। এ ছাড়াও রোগ/পোকা-মাকড় মুক্ত বীজ ইক্ষু চাষের জন্য উত্তম। গাছের যে অংশে শিকড় বের হয়েছে তা বীজ হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না। ইক্ষু বৃদ্ধির শেষ পর্যায়ে মোটা তাজা ও রসালো
বেশ কিছু কুশি বের হয় এদেরকে ওয়াটার শুট (ডধঃবৎ ংযড়ড়ঃ) বলা হয়। এগুলো বীজ হিসাবে সর্বোত্তম। তাছাড়া ইক্ষুর ডগা বীজ হিসাবে ভাল। পরিপক্ক ইক্ষু বীজ হিসাবে ব্যবহার করলে ইক্ষু কান্ডের আগার দিক থেকে তিন ভাগের দুই ভাগ ব্যবহার করা যাবে। মুড়ি ইক্ষু ক্ষেত থেকে বীজ সংগ্রহ না করাই ভাল। বীজ ইক্ষু পাতাসহ পরিবহন করতে হবে যাতে চোখগুলো নষ্ট না হয়।

ইক্ষু বীজ

নির্বাচিত বীজ ইক্ষু কাটার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। যে দা বা হাসুয়া দিয়ে বীজ ইক্ষু কাটা হয় তা মাঝে মাঝে আগুনে পুড়িয়ে/ঝলসিয়ে বা রাসায়নিক পদার্থে (শতকরা ৫ ভাগ ’লাইসল’ দ্রবনে) ডুবিয়ে জীবানুমুক্ত করে নেওয়া দরকার। বীজ ইক্ষু কাটার সময় রোগ ও পোকা-মাকড় যুক্ত কান্ড বাদ দিতে হবে।
ইক্ষু বীজ বিভিন্ন ভাবে ক্সতরী করা যায় ঃ যেমন- ১। তিন চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড
২। দুই চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড
৩। এক চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড

১। তিন চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড ক্সতরী ঃ সনাতন পদ্ধতিতে ইক্ষু রোপণের জন্য ভাল হাসুয়া দিয়ে তিন চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড ক্সতরী করে বীজ খন্ড নালায় পাশা পাশি চোখ রেখে মাথায় মাথায় রোপণ করতে হবে।

২। দুই চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড/চারা ক্সতরী ঃ

ক) দুই চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড ‣তরী ঃ নালায় লাগানো অথবা বীজ তলায় চারা ক্সতরীর জন্য ধারালো হাসুয়া/দা দিয়ে দুই চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড ক্সতরী করতে হবে। সাধারণতঃ দুই চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড নালায় পাশা পাশি চোখ রেখে মাথায় মাথায় রোপণ করতে হবে।

খ) দুই চোখ বিশিষ্ট চারা ‣তরী ঃ একটি মজবুত কাঠের উপর রেখে দুই চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড কাটতে হবে। বীজ কাটার সময়
চোখগুলি পাশে রেখে কাটতে হবে যেন চোখ গুলি নষ্ট না হয়। বীজ খন্ড কাটার পর বেড ক্সতরী করে বেডে চোখ পাশে রেখে পাশি পাশি স্থাপন করতে হবে।

৩। এক চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড ক্সতরী ঃ দুই চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড ক্সতরীর মতই একটি মজবুত কাঠের উপর রেখে চোখ গুলি পাশে
রেখে ১ চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড ক্সতরী করতে হবে। এক চোখ বিশিষ্ট বীজ খন্ড ব্যাগে অথবা বেডে স্থাপন করে চারা ক্সতরী করা যায় এবং চারা ৪০-৬০ দিনের হলে (৪-৬ পাতা বিশিষ্ট) মূল জমিতে রোপণ করা হয়।

ইক্ষু বীজ শোধন

বীজ খন্ডে লেগে থাকা অথবা মাটিতে অবস্থিত রোগ জীবানু হতে বীজকে রক্ষা করার জন্য রোপণের পূর্বে বীজ শোধন করা প্রয়োজন। বীজ খন্ড ‣তরী করে ১ লিটার পানিতে ১ গ্রাম ব্যাভিষ্টিন দ্রবনে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে বীজ খন্ড শোধন করতে হবে এবং পরে বীজ খন্ড মূল জমিতে রোপণ অথবা চারা উৎপাদনের জন্য বীজ তলায় স্থাপন করতে হবে। প্রতি টন (১০০০ কেজি) বীজ ইক্ষুর জন্য ১০০ গ্রাম ব্যাভিষ্টিন প্রয়োজন।

 

ইক্ষু নালা তৈরী

ইক্ষুর বিভিন্ন রোপণ পদ্ধতি যেমন একসারি এবং জোড়াসারির জন্য বিভিন্নভাবে নালা ক্সতরী করা যায়। একসারি পদ্ধতির
ক্ষেত্রে নিম্নোক্তভাবে নালা ক্সতরী করা যায়।
১. ট্রাক্টর এবং ট্রেঞ্চারের সাহায্যে
২. পাওয়ার টিলার এবং ট্রেঞ্চারের সাহায্যে
৩. গরুর সাহায্যে লাঙ্গল দিয়ে
৪. কোদাল দিয়ে

নালার গভীরতা ৮-৯ ইঞ্চি (২০-২৫ সেমি) হওয়া উত্তম। টেঞ্চারের সাহায্যে ক্সতরীকৃত নালার আকৃত ইংরেজি অক্ষর ’ভি’ সদৃশ।
জোড়াসারি {(১২০/১৪০ + ৬০) সেমি ৩০ সেমি}আখ চাষের ক্ষেত্রে ১২০/১৪০ সেমি প্রশস্থ স্থান সাথীফসলের জন্য রেখে
কোদাল দিয়ে ৬০ সেমি প্রশস্থ নালা ক্সতরী করা হয় এবং প্রশস্থ নালায় দু’সারি আখ রোপণ করা হয়।

ইক্ষু নালায় সার প্রয়োগ ও ব্যবস্থাপনা

রোপা ও প্রচলিত পদ্ধতির জন্য হেক্টর প্রতি একই পরিমান সার প্রয়োগ করতে হয়। তবে সার প্রয়োগ পদ্ধতির মধ্যে কিছুটা তারতম্য রয়েছে। বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের জন্য বিভিন্ন সারের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে
মোতাবেক জমিতে সার প্রয়োগ করতে হবে। সমস্ত টিএসপি, জিপসাম, জিঙ্কসালফেট এবং ১/৩ ভাগ এমপি সার বীজখন্ড/চারা
রোপণের পূর্বে নালায় প্রয়োগ করে ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। রোপা আখ চাষের ক্ষেত্রে চারা রোপণের ১৪ থেকে ২১
দিন পর ১/৩ ভাগ ইউরিয়া চারার গোড়ায় প্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে ও মাটি আলগা করে দিতে হবে। অবশিষ্ট ২/৩ ভাগ ইউরিয়া ও এমপি সার সমান দুই কিস্তিতে প্রাথমিক কুশি বের হওয়ার সময় ও কুশি বের হওয়ার শেষ পর্যায়ে প্রয়োগ করে গাছের
গোড়ায় মাটি দিতে হবে।

ইক্ষু রোপণ পদ্ধতি

বিভিন্ন পদ্ধতিতে ইক্ষু রোপণ করা যায় যেমন:
১) সনাতন পদ্ধতি এবং ২) রোপা পদ্ধতি

১) সনাতন পদ্ধতি ঃ
এ পদ্ধতিতে সাধারণত ঃ তিন চোখবিশিষ্ট বীজখন্ড ব্যবহার করে ইক্ষুর চাষ করা হয। এ পদ্ধতিতে হেক্টর প্রতি ৬-৭ টন বীজ ইক্ষুর প্রয়োজন হয়। ভালভাবে জমি ক্সতরীর পর কোদাল বা লাঙ্গল দিয়ে ৩ ফুট (৯০ সেমি:) পর পর নালা ক্সতরী করে তিন
চোখবিশিষ্ট বীজখন্ডগুলোকে চোখ পাশে রেখে নালায় মাথায় মাথায় স্থাপন করে মাটির আবরণ দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। এ পদ্ধতিতে সাধারণতঃ শতকরা ৩০-৪০ ভাগ অ্কংুরোদগম হয়। সনাতন পদ্ধতিতে তিন চোখবিশিষ্ট বীজখন্ডগুলোকে অবস্থা ভেদে একসারি,
দেড়া বা দুই সারি পদ্ধতিতে নালায় রোপণ করা যায়। এ ছাড়াও উঁই পোকার উপদ্রব থাকলে সে জমিতে আঁকাবাঁকা পদ্ধতিতে বীজখন্ড
স্থাপন করেও ইক্ষু চাষ করা যায়।

২) রোপা পদ্ধতি ঃ বীজ খন্ডের পরিবর্তে চারা ক্সতরী করে ইক্ষু আবাদ করাকে রোপা ইক্ষু চাষ বলা হয়। এ পদ্ধতিতে
ক) সনাতন পদ্ধতির মাত্র এক চতুর্থাংশ বীজের প্রয়োজন হয়
খ) জমিতে প্রয়োজনীয় গাছের সংখ্যা নিশ্চিত করা যায়
গ) বছরের যে কোন সময় ইক্ষু রোপণ করা যায়
ঘ) উৎপাদন কাল কমিয়ে ১২-১৪ মাসের পরিবর্তে ৮-৯ মাসে কমিয়ে আনা সম্ভব
ঙ) অতিরিক্ত কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়
চ) অল্প খরচে অধিক মুনাফা পাওয়া যায়

ইক্ষুর অন্তবর্তীকালীন পরিচর্যা

রোপণের পর থেকে আখ কাটার পূর্ব পর্যন্ত জমিতে করনীয় কাজগুলোকে আন্তঃপরিচর্যা হিসাবে গন্য করা হয়।

ক্স আগাছা পরি¯‥ার ও মাটি আলগা করন : আখ রোপণের পর জমিতে জোঁ এলে মাটি আলগা করে দিতে হবে। মাটি আলগা করনের সময় ক্ষেতে আগাছাগুলো (রোপণের পর ১২০-১৩৫ দিন পর্যন্ত) পরি¯‥ার করে দিতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে যে, আখের কুশি সৃষ্টিকালীন সময়ে অতিরিক্ত মাটি চারার গোড়ায় না পড়ে। এতে কুশি সৃষ্টি বিঘœ ঘটে।
ক্স সারের উপরি প্রয়োগ : কুশি বের হওয়া শুরুত্ব হলে প্রথম কিস্তি ইউরিয়া ও এমওপি সার উপরি প্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। দ্বিতীয় দফা সার কুশি বের হওয়া সম্পন্ন হলে উপরি প্রয়্গো করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। রোপা আখের
ক্ষেত্রে চারা রোপণের ২১-৩০ দিন পর ১/৩ ভাগ ইউরিয়া চারার গোড়ায় প্রয়োগ করতে হবে।
ক্স সেচ প্রয়োগ ও পানি নি¯‥াশন : মাটিতে রসের ঘাটতি দেখা দিলে জমিতে সেচ প্রয়োগ করতে হবে। ভাল ফলনের জন্য ৪/৫ টি
সেচ দিতে হবে। রোপা আখের ক্ষেত্রে চারা রোপণের পর পরই একটি জীবনী সেচ দিতে হবে। বর্ষা মে․সুমে আখের ক্ষেতে অতিরিক্ত পানি জমে নি¯‥াশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
ক্স আখের গোড়ায় মাটি দেওয়া : আগাম আখের বেলায় ঝাড় প্রতি ৮/১০ টি এবং নামলা আখের বেলায় ৫/৬ টি কুশি হওয়ার পর আর নতুন কুশি হতে না দিয়ে চারার গোড়ার মাটি দিতে হবে। এর ১ মাস পর দ্বিতীয়/শেষ বার আখের গোড়ায় মাটি দিতে হবে।

 

ইক্ষু পোকা-মাকড় ও রোগ বালাই দমন

আগাম মাজরা পোকা, ডগার মাজরা পোকা, গোড়ার মাজরা পোকা, কান্ডের মাজরা পোকা, থ্রিপস্, হোয়াইট গ্রাব প্রভৃতি পোকা দমনের জন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অবলম্বন করতে হবে।
ক্স আখ বাঁধা : আখ হেলে পড়ে গেলে কান্ডের বৃদ্ধি মন্থর হয়, পার্শকুশি গজায়, ওজন ও চিনির পরিমান কমে যায় এবং কিছু আখ মরেও যায়। এ জন্য হেলে পড়া রোধ করার জন্য আখ বেঁধে দিতে হবে।

প্রচারেঃ বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী

We will be happy to hear your thoughts

Leave a Reply

শখের কৃষি
Logo
Reset Password
Shopping cart