আখের পুষ্টি উপাদান সমূহের অভাব জনিত লক্ষণ

ইক্ষুর ক্ষতিকারক প্রধান রোগসমূহ, তাদের লক্ষণ ও দমন ব্যবস্থাপনা

আখের প্রধান রোগসমূহ ও দমন ব্যবস্থা নিম্নে প্রদত্ত হলো –

লাল পচা রোগ ঃ কলিটোট্রিকাম ফ্যালকাটাম (ঈড়ষষবঃড়ঃৎরপঁস ভধষপধঁঃঁস) নামক ছত্রাকের আক্রমণে লাল পচা রোগ হয়ে
থাকে। প্রথমতঃ পাতার মধ্যশিরায় লাল দাগের সৃষ্টি হয় এ অবস্থায় একে মধ্যশিরার (মিড রিব) রেড রট বলে। পত্রফলকে ছোপ লাল
দাগ দেখা যায় তখন একে ল্যামিনা রেড রট বলা হয। পরিপক্ক বয়সের ইক্ষুতে রোগের আক্রমণে ৩য় বা ৪র্থ পাতা প্রথমে হলুদাভ রং ধারণ করে। পরবর্তীতে অন্যান্য পাতাও হলদে হয়ে শুকিয়ে যায়। আক্রান্ত ইক্ষু লম্বালম্বিভাবে চিড়লে কান্ডের অভ্যন্তরে লম্বালম্বি লাল
দাগ দেখা যায় এবং দাগের মাঝে মাঝে আড়াআড়িভাবে সাদা দাগ দৃশ্যমান হয়। এই সাদা দাগই এ রোগের ক্সবশিষ্ট্য সূচক চিহ্ন।
আক্রান্ত গাছ থেকে এক ধরণের মদের ন্যায় গন্ধ বের হয়। পরবর্তীতে আক্রান্ত ইক্ষুর অভ্যন্তরে ফাঁপা হয়। লাল পচা রোগাক্রান্ত ইক্ষু কিছু দিনের মধ্যে মারা যায় ও শুকিয়ে যায়। আক্রান্ত ইক্ষু থেকে চিনি অথবা গুড় ক্সতরী করা যায় না। সাধারণতঃ আগষ্ট-সেপ্টেম্বর মাসেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশী হয়।

দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১) অনুমোদিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতের চাষ করতে হবে।
২) ৫৪০ সেঃ তাপমাত্রায় আর্দ্র গরম বাতাসে ২ ঘন্টাকাল বীজ শোধন করে লাগাতে হবে অথবা ৫০০ সেঃ তাপমাত্রায় গরম পানিতে ৩ ঘন্টাকাল শোধন করে বীজ ব্যবহার করতে হবে।
৩) রোগাক্রান্ত গাছ দেখা গেলে তুলে মাটিতে পুঁতে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৪) জমিতে পানি নি®‥াশনের সু-ব্যবস্থা নিতে হবে।

৫) মাজরা পোকা দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬) নীচু জলাবদ্ধ জমিতে ইক্ষুর চাষ বন্ধ করতে হবে।
৭) ইক্ষু কাটার পর পরিত্যক্ত অংশ ঐ জমিতেই পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

উইল্ট রোগ ঃ ফিউজারিয়াম মনিলিফরমি (ঋঁংধৎরঁস সড়হরষরভড়ৎসব ) নামক ছত্রাকের আক্রমণে ইক্ষুর উইল্ট রোগ হয়ে থাকে। ইক্ষু বয়স ৮-৯ মাস হলে এ রোগের আক্রমণ পলিক্ষিত হয়। আক্রান্ত গাছের পাতা নেতিয়ে পড়ে এবং উপর থেকে শুকাতে থাকে। আক্রান্ত ইক্ষু লম্বালম্বিভাবে চিড়লে কান্ডের মধ্যভাগে গিরার নিকটে গাঢ় লাল রং দেখা যায়। লাল পচা রোগের মতই উইল্ট রোগে আক্রান্ত আখের গিটের অংশে ইটের ন্যায় লাল হয় কিন্তু এক্ষেত্রে ছোপ ছোপ সাদা আড়াআড়ি দাগ দেখা যায় না। রোগের প্রকোপ
বেশী হলে আক্রান্ত ইক্ষুর ভিতরে ফাঁপা হয় এবং কান্ড শুকিয়ে কুঁচকিয়ে যায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আক্রান্ত জমির ইক্ষু শুকিয়ে যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১) অনুমোদিত ও রোগ প্রতিরোধী জাতের চাষ করতে হবে। আক্রান্ত জমিতে পরবর্তীতে ইক্ষু চাষ না করে অন্য ফসলের আবাদ করা বাঞ্চনীয়।
২) জমিতে যথাযথ উর্বরতা এবং রস সংরক্ষণ করতে হবে।
৩) রোগক্রান্ত জমিতে ইক্ষুর মুড়ি চাষ করা যাবে না।
৪) ইক্ষু কাটার পর মোথাসমেত সমস্ত মরা পাতা পুড়িয়ে ফেলতে হবে ও প্রখর রোদ্র দ্বারা আক্রান্ত জমির মাটি শুকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

কালো শীষ রোগ ঃ আসটিলাগো সিটামিনি (টংঃরষধমড় ংপরঃধসরহবধ) নামক এক প্রকার ছত্রাকের আক্রমণে স্মাট রোগ হয়ে
থাকে। ইক্ষুর বয়স ৩/৪ মাস থেকেই এ রোগ দেখা যায়। আক্রান্ত গাছের মাথা থেকে কাল চাবুকের মত কয়েক ফুট লম্বা একটা শীষ
বের হয়। আক্রান্ত গাছ সাধারণতঃ খর্বাকৃতির হয়ে থাকে। কান্ড পেন্সিলের মত চিকন ও শক্ত হয় এবং বাড়তে পারে না। আক্রান্ত গাছের পাতাগুলো সরু, খাট ও খাড়া হয় এবং হালকা সবুজ রং ধারণ করে। সাধারণতঃ মুড়ি ইক্ষুতে এ রোগের আক্রমণ বেশী পরিলক্ষিত হয়।

দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১) আক্রান্ত গাছের ঝাড় শিকড় সমেত তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
২) রোগমুক্ত অনুমোদিত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
৩) রোগাক্রান্ত জমিতে মুড়ি ইক্ষুর চাষ বন্ধ করতে হবে।
৪) রোগ-প্রতিরোধী জাতের চাষ করতে হবে।

বীজ পচা রোগ ঃ সেরাটোসিসটিস প্যারাডোক্সা (ঈবৎধঃড়পুংঃরং ঢ়ধৎধফড়ীধ) নামক এক প্রকার ছত্রাকের আক্রমণে পাইনএ্যাপল
রোগ হয়ে থাকে। রোগের জীবাণু মূলতঃ মাটিতে অবস্থা করে এবং ইক্ষুর বীজ লাগানোর পর তা আক্রমণ করে পচিয়ে দেয় ফলে বীজ গজাতে পারে না। অনেক সময় আকান্ত বীজের অঙ্কুরোদগম হলেও চারা গজানোর পরেই মারা যায়। আক্রান্ত ইক্ষু বীজ লম্বালম্বিভাবে চিড়লে ভিতরে বাদামী বা কালচে রং দেখা যায় এবং ঘ্রাণ নিলে রোগের প্রাথমিক অবস্থায় পাকা আনরসের মত গন্ধ পাওয়া যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১) রোগমুক্ত জমির অনুমোদিত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
২) বীজ লাগানোর পূর্বে বাভিস্টিন/নোইন নামক ছত্রাকনাশকের দ্রবণে ৩০ মিনিটকাল ডুবিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে।
৩) অধিক ভিজা বা অধিক শুকনো মাটিতে ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় ইক্ষু রোপণ করা যাবে না।
৪) জমি ভালভাবে চাষ ও পানি নি®‥াশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫) বীজতলায় চারা ক্সতরী করে রোপণ করতে হবে।

মুড়ি খর্বা রোগ ঃ ক্লাভিব্যাকটার জাইলি (ঈষধারনধপঃবৎ ীুষর) নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা রেটুন ষ্টানটিং রোগটি হয়ে থাকে। বাহ্যিকভাবে এ রোগের লক্ষণ বুঝা যায় না। আক্রান্ত গাছের ঝাড়-বৃদ্ধি কম হয় এবং পাতা হালকা সবুজ বর্ণ ধারণ করে। আক্রান্ত জমির ইক্ষু কোথাও উঁচু এবং কোথাও নীচু দেখা যায়। আক্রান্ত ইক্ষুর গিরাগুলো খুব সরু হয় অর্থাৎ পর্বগুলো লম্বায় ছোট হয়। আক্রান্ত গিরার অংশ ধারালো চাকু বা ছুরি দ্বারা পাতলা করে কাটলে লাল, কমলা বা বাদামী বর্ণের ছোট বিন্দু বা কমার মত দাগ দেখা যায়। গিরায় এই ছোট ছোট লাল/কমলা দাগই হচ্ছে এ রোগের ক্সবশিষ্ট্য সূচক চিহ্ন। এ রোগের আক্রমণে ইক্ষু লম্বা ও মোটা হতে পারে না। ফলে ফলন অনেক কম হয়। সাধারণতঃ বীজের মাধ্যমেই এ রোগের বিস্তার হয়।

দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১) রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
২) ৫০০ সেঃ তাপমাত্রায় গরম পানিতে ৩ ঘন্টাকাল শোধিত বীজ ইক্ষু রোপণ করতে হবে।
৩) আক্রান্ত জমি থেকে কোন ইক্ষু বীজ হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না।
৪) আক্রান্ত ইক্ষু ক্ষেতে মুড়ি চাষ বাদ দিতে হবে।
৫) ইক্ষু কাটার যন্ত্র আগুনে পুড়িয়ে অথবা লাইসল দ্বারা শোধন করে ব্যবহার করতে হবে।

ডগা পচা রোগ ঃ সিউডোমোনাস রুবরিলিনিয়ান্স (চংবঁফড়সড়হধং ৎঁনৎরষরহবধহং) নামক এক প্রকার ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এ
রোগটি হয়ে থাকে। প্রথম দিকে ইক্ষুর পাতায় শিরা বরাবর লম্বা, সরু এবং একই রকম লাল বা গাঢ় লাল রং এর টানা টানা বা ডোরা
দাগ দেখা যায়। এই ডোরা দাগই এই রোগের ক্সবশিষ্ট্য সূচক চিহ্ন। প্রাথমিক অবস্থায় দাগগুলি আলাদা থাকলেও পরবর্তীতে অনেকগুলো দাগ একত্রিত হয়ে পাতার এক বিরাট অংশে বিস্তার লাভ করে। রোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেলে দাগগুলি পাতার নিচের দিকে বাড়তে থাকে এবং ডগায় আক্রমণ করে ডগা পচা রোগ সৃষ্টি করে। আক্রান্ত ডগার পচা অংশ থেকে গন্ধযুক্ত এক প্রকার পুঁজ
বের হয় এবং আক্রান্ত অংশে ডগা ভেঙ্গে যায় ফলে ইক্ষুর বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণতঃ জুন-জুলাই মাসে যখন প্রচন্ড গরম ও বাতাসে জলীয় বাস্পের পরিমাণ বেশি থাকে তখন এ রোগ বেশি দেখা যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১) রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ইক্ষু জাতের চাষ করা।
২) নিয়মিতভাবে রোগাক্রান্ত পাতা এবং আক্রান্ত গাছের অংশ বিশেষ কেটে পুড়িয়ে ফেলা।
৩) রোগমুক্ত অনুমোদিত বীজ ব্যবহার করা।

পোড়া ক্ষত রোগ ঃ জানথোমানাস আলবিলিনিয়ান্স (ঢধহঃযড়সড়হধং ধষনরষরহবধহং) নামক এক প্রকার ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে ‘লিফ ¯‥াল্ড’ রোগ হয়ে থাকে। পাতার মধ্যশিরা বরাবর বা তার আশেপাশে খুব চিকন লম্বালম্বিভাবে পত্রফলকে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। পাতার অগ্রভাগ থেকে নিচের দিকে ঝলসানো বা পোড়া ক্ষতের সৃষ্টি হয়। পূর্ণ বয়¯‥ আখের প্রতিটি চোখ ফুটে পার্শ্বকুশি বের হয় এবং কুশিগুলিতে উলেক্সখিত লক্ষণ প্রকাশ পায়। আক্রান্ত গাছের কান্ড আড়াআড়িভাবে কাটলে উহাতে লালচে বা গাঢ় খয়েরি রং এর ছোট ছোট দাগ দেখা যায় অর্থাৎ ভা¯‥ুলার বান্ডলগুলো লাল দেখা যায়। অনেক সময় বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশ না করেও এ রোগের কারণে ইক্ষু গাছ হঠাৎ শুকিয়ে মারা যায়। এ অবস্থাকে তীব্র লক্ষণ বলা হয়।

দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১) রোগ প্রতিরোধী ইক্ষুর চাষ করা উচিত।
২) বীজ ইক্ষুকে ৫৪০ সেঃ তাপমাত্রায় আর্দ্র গরম বাতাসে ২ ঘন্টা শোধন করলে উহা রোগমুক্ত হয়।
৩) জমিতে সুষম সার ব্যবহার করতে হবে।
৪) আক্রান্ত ইক্ষু ঝাড়সহ তুলে ফেলতে হবে।

সাদা পাতা রোগ ঃ মাইকোপ্লাজমা (গুপড়ঢ়ষধংসধ) নামক এক প্রকার জীবাণু দ্বারা সাদা পাতা রোগটি হয়ে থাকে। আক্রান্ত গাছের পাতা সাদা হয়ে যায়। অনেক সময় অঙ্কুরোদগম এর পরেই কচি পাতা সাদা রং ধারণ করে। আক্রান্ত গাছের কুশিসহ এবং বয়¯‥ গাছের ডগার মধ্যস্থ পাতাও সাদা হয়। আক্রান্ত গাছের গড়ন খর্বাকৃতির হয়। ঝাড়-বৃদ্ধি খুব কম হয় এবং অধিক কুশি হয়। বয়¯‥ ইক্ষুর চোখগুলো ফুটে যায় এবং সম্পূর্ণ সাদা বা সবুজ সাদা মিশ্রিত পার্শ্ব কুশি বের হয়। ইক্ষুর ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১) সুস্থ সবল রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
২) ৫৪০ সেঃ তাপমাত্রায় আর্দ্র গরম বাতাসে বীজ ৪ ঘন্টাকাল শোধন করে রোপণ করতে হবে।
৩) আক্রান্ত ইক্ষুর ঝাড় থেকে বীজ ব্যবহার করা যাবে না।
৪) রোগাক্রান্ত ইক্ষু ঝাড় শিকড়সহ তুলে ফেলতে হবে।

মোজাইক রোগ ঃ মোজাইক (ঝঁমধৎপধহব গড়ংধরপ ঠরৎঁং) নামক এক প্রকার ভাইরাস দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে। গাঢ় সবুজ রং এর পাতার মধ্যে হালকা সবুজ ফ্যাকাশে বা হলদে রং এর ক্সবশিষ্ট্যপূর্ণ ছোট ছোট টানা টানা দাগই এ রোগের প্রধান লক্ষণ। এ সকল হালকা দাগের নির্দিষ্ট কোন আকার নেই। তবে উহা পাতার লম্বালম্বি দিকে সমস্ত পাতা জুড়ে সমভাবে বিস্তৃত থাকে। পুরানো পাতার
চেয়ে কচি পাতায় এ রোগের লক্ষণ অধিক পরি¯‥ার বোঝা যায়। পরিপক্ক ইক্ষুর কান্ডেও অনেক সময় এ লক্ষণ প্রকাশিত হয় এবং

কান্ডের উপরিভাগে ছোট ছোট চিঁর ধরে। ইক্ষু ঝাড়ের প্রতিটি পাতাতেই এ রোগের লক্ষণ দেখা যায়। এ রোগের ফলে আখের ফলন কমে যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১) রোগমুক্ত অনুমোদিত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
২) রোগ প্রতিরোধী জাতের চাষ করতে হবে।
৩) জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
৪) জমিতে সুষম সার ব্যবহার করতে হবে।

পরজীবি বিজলী ঘাস রোগ ঃ ষ্ট্রাইগা ডেনসিফ্লোরা (ঝঃৎরমধ ফবহংরভষড়ৎধ) বা বিজলী ঘাস ইক্ষুর একটি মারাত্মক পরজীবি উদ্ভিদ যা শিকড়ের সাহায্যে আখের শিকড় থেকে খাদ্যরস সংগ্রহ করে এবং সম্ভবতঃ এক প্রকার বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ইক্ষুর শিকড়ে প্রবেশ করিয়ে দেয়। ফলে আখের গাছ প্রথমে হলুদাভ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ইক্ষুর বৃদ্ধি বন্ধ হয় ও শেষে মারা যায়। দূর থেকে বিজলী ঘাস আক্রান্ত আখের জমি দেখলে মনে হয় যেন পুড়ে গেছে। মাটির ৪-১০ ইঞ্চি নিচেও বিজলী ঘাসের বীজ অঙ্কুরোদগম হয় এবং মাটির নিচেই কান্ড গজায়। মাটির নিচে থাকা অবস্থাতেই বিজলী ঘাস ইক্ষু গাছকে আক্রমণ করে। সে কারণে এ ঘাস মাটির উপরে জন্মানোর পূর্বেই ইক্ষুর অনেক ক্ষতি হতে দেখা যায়। বিজলী ঘাস লম্বায় ১-১.২৫ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর পাতা ছোট ছোট ও খসখসে। সাদা ছোট ছোট ফুল হয় এবং খুব কম সময়েই ফুল থেকে বীজ হয়। বীজ বাতাসের সাহায্যে ছড়িয়ে যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা ঃ
১) বিজলী ঘাসের আক্রমণ হয় এরূপ চিহ্নিত জমিতে সুষম সার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ইউরিয়া এবং পটাশ সার হেক্টর প্রতি যথাক্রমে ৩৯৫ কেজি এবং ২৪৭ কেজি সমান তিন কিস্তিতে যেমন রোপণ সময়ে নালায়, বৃষ্টিপাতের পর এপ্রিল ও মে মাসে ইক্ষুর গোড়ায় প্রয়োগ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
২) বিজলী ঘাস জমিতে দেখা গেলে ফুল ফোটার পূর্বেই তুলে ফেলতে হবে অথবা ইউরিয়া দ্রবণ (১ কেজি ইউরিয়া ২০ লিটার পানিতে মিশিয়ে দ্রবণ ক্সতরী করতে হবে) বিজলী ঘাসের উপর দুপুরের রোদ্রের সময় ¯েপ্র করতে হবে।
৩) আক্রান্ত জমিতে পরবর্তীতে ইক্ষু আবাদ না করে পাট বা অন্যান্য ফসল চাষ করা উচিৎ।
৪) কোন অবস্থাতেই আক্রান্ত জমিতে মুড়ি ইক্ষুর আবাদ করা উচিত নয়।

সমন্বিত পদ্ধতিতে আখের রোগ দমন ব্যবস্থাপনা

রোগবালাই যাতে না হতে পারে তার জন্য রোগবালাই হওয়ার পূর্বেই ব্যবস্থা নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। কেননা একবার যদি রোগে আক্রান্ত হয় তবে তার প্রতিকার অত্যন্ত জটিল প্রায় ক্ষেত্রে কোন সমাধান সম্ভাব নহে। উল্লেখ্য যে কোন একক ব্যবস্থা রোগ দমনের জন্য কার্যকরী নয়। একমাত্র সমন্বিত কমসূচীর মাধ্যমে রোগ দমন সম্ভব। নিম্ন বর্ণিত সুপারিশ মালা হতে নির্দিষ্ট কোন রোগ দমনের জন্য সমন্বিত পদ্ধতিতে উপযোগী ব্যবস্থা সমূহ গ্রহণ করলে নিশ্চিতভাবে রোগদমন বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

১) রোগ প্রতিরোধী জাত, যেমন ঈশ্বরদী ২/৫৪, ঈশ্বরদী ১৬, ঈশ্বরদী ২০, ঈশ্বরদী ৩৭, ঈশ্বরদী ৩৮, ঈশ্বরদী ৩৯, ঈশ্বরদী ৪০, বিএসআরআই আখ ৪১, বিএসআরআই আখ ৪৩, বিএসআরআই আখ ৪৪ ইত্যাদি অনুমোদিত জাতগুলো আবাদ করা এবং ভবিষ্যতে মুক্তিপ্রাপ্ত কেবল অনুমোদিত জাতের চাষ করা।
২) রোগমুক্ত বীজ উৎপাদনের জন্য ৫৪০ সেঃ তাপমাত্রায় ও ৯৫% আদ্রতায় ২ ঘন্টাকাল আদ্র গরম বাতাসে শোধনকৃত বীজ বা উহা চালু না হওয়া পর্যন্ত ৫০০ সেঃ তাপমাত্রায় গরম পানিতে ৩ ঘন্টাকাল শোষিত বীজ দ্বারা রোপা পদ্ধতিতে দুই স্তর
বিশিষ্ট ভিত্তি বীজ এবং প্রত্যায়িত বীজ উৎপাদন নিশ্চিত করা।
৩) বাণিজ্যিক আখ চাষের জন্য প্রত্যায়িত বীজ উৎপাদন নিশ্চিত করা।
৪) আখ লাগানোর পূর্বে বীজ খন্ড অনুমোদিত বীজশোধক যথা বাভিষ্টিন/নোইন/জেনুইন/এইমকোজিম/ কোরোজিম ইত্যাদি
কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাক বারকের ০.১% দ্রবণে ৩০ মিনিট ধরে সম্পূর্ণ চুবিয়ে রোপন করতে হবে।
৫) সাদাপাতা/ঘাসিগুচ্ছ, স্মাট, মোজাইক, লাল পচা, এবং উইল্ট জাতীয় রোগের আক্রান্ত গাছ/ঝাড় সম্পূর্ণ উঠিয়ে আগুনে পুড়িয়ে নষ্ট করতে হবে।
৬) যে সমস্ত জমি বা এলাকায় বিজলী ঘাস দেখা যায় সে সমস্ত জমি বা এলাকা থেকে কোন বীজ অন্য কোন এলাকায় বীজ আখ হিসেবে সরবরাহ বন্ধ করা।

৭) বিজলী ঘাস দমনের জন্য সুষম সারের ব্যবহার, বিশেষ করে আখ লাগানোর সময় ফসফেট সার প্রয়োগ ছাড়াও হেক্টর প্রতি ৩৯৫ কেজি করে ইউরিয়া এবং ২৪৭ কেজি পটাশ সার সমান তিন কিস্তিতে যথা রোপন সময়ে নালায় এবং বৃষ্টিপাতের পর এপ্রিল ও মে মাসে আখের গোড়ায় প্রয়োগ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। এরপরেও বিজলী ঘাস দেখা দিলে ১ঃ২০ অনুপাতে যথাক্রমে ইউরিয়া এবং পানির দ্রবণ বিজলী ঘাসের উপর সিঞ্চন করলে ভালভাবে দমন হয়।
৮) পাতার লাল টানা দাগ (রেড স্ট্রাইপ) এবং ডগা পঁচা আক্রান্ত গাছের শুধুমাত্র আক্রান্ত পাতা বা ডগা অথবা অধিক আক্রান্ত গাছ সম্পূর্ণ তুলে পুড়িয়ে ফেলা।
৯) পাতার বিভিন্ন প্রকার রোগ যথাক্রমে চক্ষু দাগ, হলুদ দাগ, বাদামী দাগ, পাতা ঝলসানো ইত্যাদি দমনের জন্য ০.২% কপার অক্সি-ক্লোরাইড দ্রবণ ব্যবহার করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। প্রয়োজনবোধে ১৫ দিন পর পর ২/৩ বার ¯েপ্র করা।
১০) বীজ আখ ক্ষেতে কাজের সময় বা বীজ কাটার সময় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি যেমন হাসুয়া, কোদাল, কাচি ইত্যাদি ব্যবহারের পূর্বে সবই জীবানু নাশক ঔষধ দ্বারা (৫% ফিনাইল) বা আগুনে পুড়িয়ে শোধন করতঃ নির্বিজন করতে হবে।
১১) আখের প্রধান পোকামাকড় যা রোগ বিস্তারে সহায়তা করে তা দমন করা।
১২) আখের জমি সব সময় আগাছামুক্ত রাখা এবং অন্যান্য রোগ পোষক পাছ হতেও মুক্ত রাখা।
১৩) ক্ষেতের আখ কাটার পর আখের শুকনো পাতা এবং পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে চাষের সাথে মিশিয়ে দেয়া যাতে রোগের
জীবাণু ও পোকার উৎস বা আস্তানা ধ্বংস হয়ে যায়।
১৪) আখের জমির প্রধান কোন রোগ বেশী পরিমাণে দেখা দিলে পরবর্তী বছর সে জমিতে আখের আবাদ না করে ক্রপ
রোটেশনে অন্য ফসলের আবাদ করা।
১৫) অধিক নিচু জমিতে অর্থাৎ যেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে সে সমস্ত জমিতে আখ রোপন না করা।
১৬) সময়মত সঠিক পদ্ধতিতে সুষম সারের প্রয়োগ নিশ্চিত করে খাদ্যের অভাব জনিত রোগ দমন করা।
১৭) প্রয়োজনে সময়মত সেচ প্রয়োগ এবং জলাবদ্ধ জমি হতে পানি নি®‥াশনের ব্যবস্থা গ্রহণ।
১৮) সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর মাসে মারাত্মক রোগের প্রকোপ বেশী দেখা যায়। এ সময় আক্রান্ত জমির আখ মিল চালু হলে
শীঘ্র কর্তন এবং সরবরাহ নিশ্চিত করে রোগের দ্রুত বৃদ্ধি রোধ করা।

We will be happy to hear your thoughts

Leave a Reply

শখের কৃষি
Logo
Reset Password
Shopping cart